টানা ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে রবিবার (১২ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন না করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তগুলো ইরান মেনে না নেওয়ায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সফর শেষে ভ্যান্স বলেন, ‘দুর্সংবাদ হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। আমি মনে করি, এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি নেতিবাচক। আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি।’
ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, আলোচনার সময় তিনি অন্তত ছয়বার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে প্রধান বিরোধের জায়গা ছিল ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি। ভ্যান্স বলেন, আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এমন কোনো প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও অর্জন করবে না যা দিয়ে তারা দ্রুত পরমাণু বোমা বানাতে পারে। এটিই প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য ছিল।
অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ চাহিদার কারণে চুক্তিটি সফল হতে পারেনি। তবে ভ্যান্সের বক্তব্যের আগে ইরানের সরকার এক বার্তায় জানিয়েছিল যে আলোচনা চলবে এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞরা নথি বিনিময় করবেন।
এক দশকেরও বেশি সময় পর এটিই ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম সরাসরি বৈঠক এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা। এই আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে দুই সপ্তাহ আগে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি। যুদ্ধের কারণে ইরান বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
ইরানি প্রতিনিধি দলটি কালো পোশাক পরে বৈঠকে অংশ নেন। সম্প্রতি এক যুদ্ধে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্যদের স্মরণে তারা শোক পালন করছিলেন। ইরানি সরকার জানিয়েছে, তারা মার্কিন হামলায় নিহত এক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জুতো ও ব্যাগ সঙ্গে এনেছিলেন। উল্লেখ্য, একটি সামরিক কম্পাউন্ডের পাশের ওই স্কুলে হামলার ঘটনাটি পেন্টাগন তদন্ত করছে বলে জানালেও রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীই সম্ভবত এর জন্য দায়ী।
আলোচনা চলাকালেই মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও ইরান তাদের জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতির দাবি অস্বীকার করেছে।
রয়টার্স জানায়, কাতারসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে থাকা ইরানের জব্দ করা অর্থ ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে বলে ইরান দাবি করলেও ওয়াশিংটন তা অস্বীকার করেছে। এছাড়া তেহরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যাতে তারা কখনোই পরমাণু বোমা তৈরি করতে না পারে।
এই ঐতিহাসিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ মানুষের শহর ইসলামাবাদকে কার্যত লকডাউন করে রাখা হয়েছিল। হাজার হাজার আধা-সামরিক বাহিনী ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়। এক বছর আগেও কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে থাকা পাকিস্তানের জন্য এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
