'মেসির হাতে যখন ট্রফি, আমি তখন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে'- কাতার বিশ্বকাপের ভয়ংকর সত্য ফাঁস

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। লুসাইল স্টেডিয়ামের আকাশ তখন আতশবাজিতে রাঙানো। আরবের ঐতিহ্যবাহী 'বিশত' গায়ে জড়িয়ে লিওনেল মেসি যখন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং কাতারের আমির। ঠিক সেই মুহূর্তে দোহা থেকে কয়েক মাইল দূরে আল রাইয়ান কারাগারের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন আব্দুল্লাহ ইবাইস। 

বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির সাবেক এই যোগাযোগ পরিচালক চার বছর পর জর্ডানে বসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই মুহূর্তটি স্মরণ করে বলেন, 'মেসি যখন ট্রফিটা তুলল, আমি বুঝলাম কাতার জিতে গেছে। তারা একটা নিখুঁত আয়োজন চেয়েছিল এবং তারা তা পেয়েছে। আর আমার গল্পটা? সেটা তারা মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, কারো তাতে কিছু যায় আসে না।'

বিদ্রোহের শুরু একটি ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে 

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে। দোহা শহর থেকে দূরে আল শাহানিয়া এলাকায় শত শত শ্রমিক বকেয়া বেতন এবং অমানবিক জীবনযাপনের প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করেন। আন্তর্জাতিক মহলে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে কাতার আয়োজক কমিটি ইভহাইসকে নির্দেশ দেয় এটি 'মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দিতে। 

ইবাইস বলছিলেন, 'কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল আমি যেন বলি এগুলো সব সাজানো এবং অন্যান্য দেশ কাতারের ইমেজ নষ্ট করতে এই ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু আমি নিজের চোখে না দেখে তা করতে চাইনি। ছুটির দিনে আমি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা ছিল ভয়াবহ। সেখানে কোনো পানীয় জল ছিল না, শ্রমিকদের শাসানো হচ্ছিল। আমি বুঝেছিলাম, কর্তৃপক্ষ আমাকে দিয়ে আস্ত একটা মিথ্যা বলাতে চায়।'

ইবাইস যখন এই মিথ্যা প্রচারে অস্বীকৃতি জানান এবং পদত্যাগ করেন, তার বস তাকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছিলেন—'প্রস্তুত থেকো, এর পরিণাম ভালো হবে না।'

আব্দুল্লাহ ইবাইস

আমেরিকান সিনেমা ভাবছ?

পদত্যাগের দুই মাস পর ইবাইসের  জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করে। ইবাইস সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করে বলেন, 'আমি যখন আইনজীবী চাইলাম, একজন অফিসার চিৎকার করে বললেন—'নিজেকে কি আমেরিকান সিনেমার হিরো ভাবছ? কোনো আইনজীবী এই ঘরে পা রাখলে আমরা তার পা ভেঙে দেব'।'

এরপর তার সামনে একটি সাজানো জবানবন্দি রেখে বলা হয় সই করতে। হুমকি দেওয়া হয়—সই না করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে তিনি জালিয়াতির শিকার হয়ে সেই মিথ্যা জবানবন্দিতে সই করতে বাধ্য হন।

ফিফার 'সহযোগিতা' ও দীর্ঘ কারাবাস

ইভহাইস যখন ৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ পান, তখন তিনি ফিফার কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ফিফা শুধু বলেছিল, 'সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে'—ব্যাস, এটুকুই। এরপর ফিফা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়। ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর তাকে আল রাইয়ান ন্যাশনাল জেলে পাঠানো হয়। 
ইবাইস বলেন, 'এক রুমে ৩০ জনের বেশি মানুষ একে অপরের ওপর ঘুমাতাম। আমি অনশন শুরু করলে জেলের এক বড় কর্মকর্তা এসে বলেছিলেন—'তুমি এখানে মরলে আমার কিছু যায় আসে না, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো নির্দেশ আমার কাছে নেই।'

ইবাইস সরাসরি ফিফাকে এই অন্যায়ের সহযোগী হিসেবে দায়ী করেছেন। তার মতে, ফিফা শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক মুনাফা দেখেছে। তারা কাতারের সাজানো বর্ণনাকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। ২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি আরবে দেওয়ার মাধ্যমে ফিফা প্রমাণ করেছে যে তারা মানবাধিকারের চেয়ে অর্থের ঝনঝনানিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

শেষ লড়াইয়ের ডাক

২০২৫ সালের মার্চে মুক্তি পাওয়ার পর বর্তমানে ইভহাইস তার পরিবারের সঙ্গে জর্ডানে আছেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তার আইনজীবীরা ফিফাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন, কিন্তু আবারও মিলেছে কেবল নীরবতা। এবার তিনি সুইজারল্যান্ডের আদালতে ফিফার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ইবাইসের কন্ঠে এখন দৃঢ়তা, 'আমি জানি আমি মরুভূমিতে এক কণা বালু মাত্র। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারছি, আমি থামব না। আমি এটা নিজের কাছে এবং সেই বঞ্চিত শ্রমিকদের কাছে ঋণী।'

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত