মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশে^র বিভিন্ন দেশে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকারও নানা প্রস্তুতি নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের বিদেশ সফর স্থগিত করার বিষয়টি সব মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে। তারপরও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন অজুহাতে বিদেশ সফর করছেন। তেমনি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস হাজিদের সেবা দেওয়ার নামে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে গত ৬ এপ্রিল সংস্থাটির ৩৫ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম চূড়ান্ত করে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে বলে বিমান সূত্র নিশ্চিত করেছে। অথচ গত বছর হজের সময় একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও সৌদি আরব যাননি। বিমানের এবারের হজবহরে খরচ হবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। এটাকে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বিলাসিতা হিসেবে দেখছেন।
বিমানের চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বিমানের পরিদপ্তরস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারী পবিত্র হজ ২০২৬-এর অপারেশনাল কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে অস্থায়ী প্রি এবং পোস্ট হজ পোস্টিয়ের জন্য তাদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার চার দিন আগে তালিকাভুক্তদের জেদ্দায় যেতে হবে। তারা সব মিলিয়ে ৩৭ দিন সৌদি আরবে অবস্থান করবেন। তা ছাড়া প্রি এবং পোস্ট হজ ফ্লাইট শেষে যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জরুরি দাপ্তরিক প্রয়োজনে না আসতে পারেন তাহলে তিনি পরবর্তী শিডিউল ফ্লাইটে ঢাকায় আসবেন। হজ ব্যবস্থাপনার সার্বিক কার্যক্রম রিজিওনাল ম্যানেজার পালন করবেন এবং কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ওই তালিকায় একজন হিন্দু কর্মকর্তার নামও রয়েছে। তিনিও হাজিদের সেবা করতে সৌদি আরব যাবেন। কৃচ্ছ্রসাধনের সময়ে এই বিশাল বহর নিয়ে এখন সমালোচনা হচ্ছে খোদ বিমানেই।
বিমানসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী হজ মৌসুমকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সফর নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গত বছর যেখানে একজনকেও সৌদি আরব পাঠানো হয়নি, সেখানে এবার প্রায় ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ‘বিশাল বহর’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এবারের হজ মৌসুমে বিমানের হজ অপারেশন পরিচালনার নামে বিশেষ টিম সৌদি আরব যাচ্ছে। এ বহরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কারিগরি ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বহরে যাচ্ছেন : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের হজবহরে যেসব কর্মকর্তার নাম রয়েছে তারা হচ্ছেন ডেপুটি ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) তামান্না আলী তাবাসসুম, ফয়সল কবির, বাদশাহ ফাহাদ, মো. আব্দুল্লাহ, মহিদুল ইসলাম শান্ত, মাহফুজ আলী, কমার্শিয়াল সুপারভাইজার আল আমিন মিয়া, তামিজ উদ্দিন সরকার, রেজাউর রহমান, রিপন আলী, ফারহানা হুসাইন, শাহিনুর ইসলাম, মো. মাহসিন, মহিউদ্দিন আহমেদ এবং জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার ইউসুফ ইকরাম, গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন, সাজেদা বেগম, সহকারী ব্যবস্থাপক জিএস সায়িদা আয়েশা সুলতানা, গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার শামসুদ্দিন আহমেদ বারী, হুমায়ুন কবির, আবদুস সালাম, শফিকুল ইসলাম খান, এএম আশরাফুল আলম চৌধুরী, সাইদুর রহমান, আলিকুজ্জামান ভুঁইয়া, গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার সান্তু হাওলাদার, সিনিয়র সহকারী অপারেশন মোহাম্মদ শামসুল হুদা, জুনিয়র অপারেশন অফিসার মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন খান, মনজুর মোরশেদ, হেলাল উদ্দিন, জাকিউল আলম, ডেপুটি ম্যানেজার অপারেশনস জান্নাতুল ফেরদৌস, জুনিয়র অপারেশন অফিসার কানিজ ফাতেমা, জয়নাল আবেদীন, দেবাশিষ কুমার কুন্ডু, উপ-ব্যবস্থাপক সারওয়ার্দী বিশ্বাস, উপ-ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম, আবিদুল মুহাইমিন, জুনিয়র অফিসার (হিসাব) গোলাম মোস্তফা ও সিস্টেম বিশ্লেষক (প্রোগ্রামার) শাহীর রহমান।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হজযাত্রীদের সেবা ও কষ্ট লাঘব করতেই মূলত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সৌদি আরব পাঠানো হচ্ছে। এটাকে বিলাসিতা বলা যাবে না। গত বছর বিমানের লোক না পাঠানোর কারণে হজযাত্রীদের কিছু সমস্যা হয়েছিল।’
বহরের পেছনে ব্যয় হবে বিশাল অর্থ : এ প্রসঙ্গে বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিগত বছরের (২০২৫) হজ ফ্লাইটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ ফ্লাইটের সঙ্গে যারা গেছেন ওইসব সীমিত জনবল এবং স্থানীয় বিমান অফিসের সহায়তায় সৌদি আরবে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। তৎকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে কোনো বিশেষ বহর পাঠানো হয়নি। এতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছিল। তবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কেন এই আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে সেটা বোধগম্য নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশ সফর স্থগিত করা হলেও ৩৫ জনের বিশাল বহর হজে যাওয়া নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ জেগেছে। সৌদি আরব যাওয়ার জন্য অনেকে তদবির পর্যন্ত করেছেন। তিনি আরও জানান, যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী সৌদি আরব যাচ্ছেন তাদের পেছনে ৮ কোটি টাকার বেশি খরচ হবে। এমনিতেই বিমানের আর্থিক অবস্থা ভালো না। তা ছাড়া বিশে^র অর্থনৈতিক অবস্থায়ও টালমাটাল। ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। এই সময় এ খরচ যুক্তি সংগত নয়।
সফরের নামে বিলাসিতা : নাম প্রকাশ না করে একজন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান নানাবিধ আর্থিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। একদিকে জ্বালানি তেলের বকেয়া বিল, অন্যদিকে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সব মিলিয়ে সংস্থাটি যখন ঋণের চাপে জর্জরিত, তখন ‘হজবহর’ নাম দিয়ে এ সফর অসংগত। জেদ্দা ও মদিনায় বিমানের নিজস্ব সেটআপ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে বিশাল বহর পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা কর্তৃপক্ষকে অনুধাবন করতে হবে। হজ মৌসুমে জেদ্দায় লোকবল কম থাকলে মদিনা ও রিয়াদ থেকে বিমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জেদ্দায় আনা যেত। গত বছর তো কোনো লোক পাঠায়নি। তাহলে কি হাজিরা কোনো সমস্যায় পড়েছেন? আসলে আমাদের দেশ নিয়ে হয়তো কেউ চিন্তা করে না। আর না হয় এই দুর্দিনে এত টাকা খরচ করে সৌদি আরবে কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঠায়?
এবার হজে যাবেন ৭৮,৫০০ হজযাত্রী : চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন। এসব হজযাত্রীর ভিসা প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৪১৪ জন হজযাত্রীর ভিসা সম্পন্ন হয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৪৯৮ জনের ভিসা সম্পন্ন হয়। গত বছরের তুলনায় এবার হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার কম। গত বছর ছিল ৬৫ হাজার হজযাত্রী।
বিমান বহন করবে ৩৯,৬৫০ যাত্রী : এবার বাংলাদেশ বিমান পরিবহন করবে ৩৯ হাজার ৬৫০ জন হজযাত্রী। বাকি যাত্রী পরিবহন করবে সৌদি এয়ারলাইনস ও ফ্লাইনাস। তুলনামূলক এ বছর কমসংখ্যক হাজি হজে যাচ্ছেন। গত বছর হজ ডিউটিতে বিমানের পক্ষে একজনও সৌদি আরবে পাঠানো হয়নি। এবার বিমান কর্তৃপক্ষ ১২৮টি ফ্লাইটে হজযাত্রীদের পরিবহন করবে। ইতিমধ্যে হজযাত্রীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনোভাবেই নিষিদ্ধ পণ্য বহন করা যাবে না। সৌদি আরবের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নেশাজাতীয় ওষুধ, তামাকপাতা, জর্দা, গুল, পানপাতা, শুঁটকি, রান্না করা খাবার ও পচনশীল দ্রব্য বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব পণ্য পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হজ পালনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, এমনকি হজ করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।
অবশেষে কেটেছে ফ্রিকোয়েন্সি জটিলতা : হজ মৌসুম সামনে রেখে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার অবসান হয়েছে। যাত্রীসংখ্যার তুলনায় ফ্লাইট অনুমোদন কম থাকায় প্রায় পাঁচ হাজার হজযাত্রীর সৌদি আরবে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করে এ বাধা সমাপ্তি করেছে। গত সপ্তাহে সৌদি সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অতিরিক্ত ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে।