মুদি দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপসবখানেই চকচকে মোড়কে বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপসসহ বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকসের সম্ভারে ভরপুর। এসব খাবারের দাম কম, সহজলভ্য, বিজ্ঞাপনও আকর্ষণীয়। বিশেষ করে শিশুদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করেছে মনলোভা মোড়কের খাবার।
তবে প্যাকেটের ভেতরের খাবারে কতটা চিনি, লবণ আছে; ক্ষতিকর চর্বি বা স্বাস্থ্যঝুঁকির উপাদান আছে কি নাসেই প্রশ্নের উত্তর প্রায় অজানা। না জেনে-বুঝে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ খাচ্ছে এ সব খাবার। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, সবচেয়ে বেশি হুমকিতে আছে শিশুরা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বব্যাপী অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এসব খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাট থাকে। এগুলো স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রাপ্তবয়স্কদের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসংক্রামক রোগ থেকে মুক্ত থাকতে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি। আর প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট, বোধগম্য, সহজ সতর্কবার্তার মাধ্যমে কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচনের সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) মোকাবিলায় প্রতিরোধই সবচেয়ে টেকসই কৌশল। এ ক্ষেত্রে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।’
এফওপিএলের ক্ষেত্রে খাবারের প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে। যেমন ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে বেশির ভাগ পণ্যে পুষ্টি তথ্য থাকে প্যাকেটের পেছনে। এটি অত্যন্ত ছোট অক্ষরে এবং জটিল সংখ্যা দিয়ে লেখা হয়। সাধারণ একজন ক্রেতার পক্ষে তা পড়া, বোঝা এবং তুলনা করা প্রায় অসম্ভব।
বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার শনাক্ত করতে গত বছর ৯৭৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর-কিশোরী ও শিশুর ওপর দেশব্যাপী একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রায় ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকেন। গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৪টি খাদ্য ক্যাটাগরির আওতায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে ৬৩ শতাংশে উচ্চমাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২৩ সালের আরেকটি গবেষণায় দেশে প্রচলিত ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার পরীক্ষা করে বেশিরভাগ খাবারেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি পরিমাণ চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি পাওয়া গেছে। অনেক পণ্যের প্যাকেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্সফ্যাট, চিনি ও লবণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত ছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাবার রঙিন করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে খাবারের রঙের বদলে কাপড়ের রঙ ব্যবহার করা হয়। এটি ক্যানসার সৃষ্টি করে, কিডনি-লিভার ও পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্বাদ বাড়ানোর জন্যও এমন কিছু উপাদান যুক্ত করা হয়, যেগুলোর একটা অংশ ক্ষতিকর। যেমন পাউরুটি মিষ্টি করার জন্য পটাশিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করা হয়। এটিও ক্যানসার তৈরি করতে পারে, লিভার-কিডনির ক্ষতি করে। খাবারের ক্ষতিকর রঙ ও উপকরণ শিশুর শরীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাদের বেড়ে ওঠাকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এলার্জি, চর্মরোগ তৈরি করে।’
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের সামনে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা (এফওপিএল) জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে দেশে ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।’
জানা গেছে, বিশ্বের ৪৪টি দেশে ইতিমধ্যে বাধ্যতামূলক বা স্বেচ্ছামূলকভাবে এফওপিএল চালু করা হয়েছে। চিলি, মেক্সিকো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডাসহ কয়েকটি দেশে দেখা গেছে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল ব্যবহার ভোক্তা ও উৎপাদকের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশেও বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ। ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়ায় বাধ্যতামূলক এফওপিএলের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ (সোডিয়াম), স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে প্যাকেটে কালো অষ্টভুজাকৃতির ‘অতিরিক্ত’ সতর্কবার্তা দিতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেগুলেশনের খসড়া খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তারা ৩০ জুন এটি অনুমোদন করেছে। এখন সরকারের নিয়ম অনুসারে হয়তো আইন মন্ত্রণালয় পাঠানো হবে। আশা করি, দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত অনুমোদন হয়ে যাবে। সবাই এই বিষয়ে উৎসাহী, কারণ সবাই এটা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন’