বৈশাখ ঘিরে দেবীপুরে ব্যস্ততা

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

শুকনো নলখাগড়া বা নল কেটে মাপমতো টুকরা করছেন কেউ। আবার কেউ টুকরা করা নলখাগড়ায় রঙ করছেন। নলের টুকরাগুলোয় রঙিন জরি ও বেলুন লাগাতে ব্যস্ত অন্যরা। এভাবেই তৈরি করা হচ্ছে গ্রামবাংলার পরিচিত নলের বাঁশি। নলের এই বাঁশি সাধারণত শিশুদের কাছে ‘খেলনা বাঁশি’ হিসেবে পরিচিত।

বাঁশি তৈরির এই কর্মযজ্ঞ চলছে নওগাঁ সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে। সবুজে ঘেরা এ গ্রামের মানুষ প্রায় কয়েক যুগ ধরে নলখাগড়া দিয়ে খেলনা বাঁশি তৈরি করছেন। গ্রামটির পরিচিতি খেলনা বাঁশির গ্রাম নামে। এখানে প্রায় ২ হাজার মানুষের বসবাস, যাদের অর্ধেকই বাঁশি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সারা বছরই তারা বাঁশি তৈরি করেন। তবে ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যেষ্ঠ মাসে ব্যস্ততা বাড়ে। কারণ, এ সময় আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসে গ্রামীণ মেলা। এসব মেলায় বিক্রির জন্য ফেরিওয়ালা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দেবীপুরের কারিগরদের কাছ থেকে বাঁশি নিয়ে যান।

দেবীপুর উত্তরপাড়ার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার আবাদি জমি নাই। এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নল কিনে ৮ হাজার বাঁশি তৈরি করেছি।’ বেশি লাভের আশায় তিনি নিজেই মেলায় মেলায় বাঁশি বিক্রি করতে চান জানিয়ে বলেন, ‘আশপাশের জেলাগুলোতে যদিও খুব বেশি মেলার খোঁজখবর পাচ্ছি না। তবে এখন পর্যন্ত ফেরি করে ২ হাজারের মতো বাঁশি বিক্রি করেছি।’

গতকাল রবিবার সকালে সরেজমিন দেবীপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির বারান্দা, আঙিনা ও বাড়ির বাইরের খোলা জায়গায় গাছের ছায়ায় কারিগররা বাঁশি তৈরি করছেন। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই ব্যস্ত। কেউ নলখাগড়া বা নলের গাছ কেটে বাঁশির বিভিন্ন ভাগ তৈরি করছেন। আবার কেউ সেই বাঁশিতে জরি ও বেলুন লাগাচ্ছেন।

গ্রামের যারা বাঁশি বানান, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য, ৭০ থেকে ৮০ বছর আগে এই গ্রামে আলেক ম-ল নামে এক ব্যক্তি বাঁশি তৈরির কাজ শুরু করেন। তার দেখাদেখি একসময় পুরো গ্রামের মানুষ এ পেশায় জড়িয়ে পড়েন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসে প্রতি হাজার বাঁশি ২ থেকে ৫ হাজার টাকায় কিনে নেন। এসব বাঁশিই আবার মেলায় নিয়ে তারা ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি করেন।

বাঁশির কারিগর আলেক ম-ল নেই। কিন্তু তার ছেলে ৬০ বছর বয়সী আনিসুর রহমান বাবার পেশা আঁকড়ে ধরে এখনো জীবিকা নির্বাহ করছেন। আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমার বাবা এ গ্রামে প্রথম বাঁশি তৈরির কাজ শুরু করেন। ছোটবেলা থেকে বাবা-মাকে বাঁশি বানানো দেখতে দেখতে আমিও বাঁশি বানানো শিখেছি। এখন তো গ্রামের প্রায় সব পরিবারেই কম-বেশি বাঁশি তৈরি হয়।’

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের শতাধিক পরিবার সারা বছর নলের বাঁশি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গুটি কয়েক পরিবার নিজেদের জমিতে নল বা নলখাগড়ার চাষ করেন। আবার অনেক হতদরিদ্র পরিবার বিভিন্ন এনজিও এবং মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নল কিনে বাঁশি তৈরি করেন। সারা বছর বাঁশি তৈরি হলেও চৈত্রসংক্রান্তি, বৈশাখী মেলা, দুই ঈদ ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে বসা গ্রামীণ মেলায় বাঁশি বিক্রি বাড়ে। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে বৈশাখী মেলা।

কারিগর আনিছুর রহমান বলেন, সারা বছর বাঁশি তৈরি হলেও বৈশাখী মেলা উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি বাঁশি বিক্রি হয়। এবার চৈত্র মাসের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ী ও ফেরিওয়ালারা বাঁশি কেনার জন্য বায়না দিয়েছেন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘এবার বাঁশির ব্যবসা ভালো হবে।’ বাড়ির বাইরের খোলা জায়গায় মেহগনি গাছের ছায়ায় বসে বাঁশি তৈরি করছিলেন নাসির উদ্দিন ও মৌসুমি বেগম দম্পতি। তারা বলেন, ‘বাঁশি তৈরিই আমাদের প্রধান পেশা।’ পরিবারের ছয় সদস্যের সবাই বাঁশি বানাতে পারে। এবার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন গ্রামীণ মেলা উপলক্ষে তারা ২০ হাজার বাঁশি তৈরি করেছেন,  যার মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫ হাজার বাঁশি। এখনো অর্ডার আছে প্রায় ৮ হাজার বাঁশির।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত