বৈশাখের বিলুপ্ত আচার-অনুষ্ঠান

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০২ এএম

বাংলা সনের সূত্রপাত এবং এর প্রবর্তক হিসেবে কার নাম উল্লেখযোগ্য তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে চারজন রাজা ও সম্রাটের কথা আলোচিত হয়ে আসছে।

বলা হয়েছে গৌড়ের সম্রাট শশাঙ্কের নাম। সপ্তম শতক। কিন্তু গবেষক ও ঐতিহাসিকরা ঐতিহাসিক বিবেচনায় তা নাকচ করে দিয়েছেন। প্রসঙ্গ এসেছে সম্রাট আকবরের। ঐতিহাসিক কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন প্রমুখ আকবর যে বাংলা সনের প্রবর্তক তার সমর্থন করেছেন। কিন্তু অধ্যাপক আহমদ শরীফ তা যুক্তির মাধ্যমে নাকচ করে দিয়েছেন। আকবর প্রবর্তন করেছিলেন ‘ইলাহি সন’ বা ইলাহি অব্দ। আইন-ই আকররি-তে এ বিষয় বিস্তারিত জানা যায়। আবুল ফজলের এই ব্যাপারে মন্তব্য রয়েছে তার গ্রন্থে।

মধ্যযুগে সুলতানী আমলের সুলতান হোসেন শাহ্র নাম উল্লেখ করেছেন বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে। তবে এই মতামতও প্রতিষ্ঠা পায়নি। তাদের পরম্পরা ধরে নিয়ে বলা হয়েছে মুসলমান কোনো রাজা বা সুলতানের বাংলা সনের প্রবর্তক হয়ে থাকবে। তাদের বক্তব্য বাংলা সন বা সাল মধ্যযুগের ফসল। সন আরবি শব্দ আর সাল হচ্ছে ফারসি শব্দ। মধ্যযুগের সুলতানী আমলে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির মর্যাদাকে বাড়িয়ে তুলেছে আরবি ফারসির প্রভাব। এই মত অবশ্য পুঁথি গবেষক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের। তার মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে শামসুজ্জামান খান বলেছেন, ‘বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের সঙ্গে যে মুসলমান সুলতান বা সম্রাটদের সম্পর্ক আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

বাংলা সনের প্রবর্তন কে কখন কীভাবে করেছেন তা ইতিহাসের দিকে না তাকিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে নানান সময়ে। গবেষকরা দেখিয়েছেন মধ্যযুগের বেহুলার বারমাসি এবং ফুল্লরার বারমাসির সময়কাল ১৯৫৬ সালের আগে রচিত। ১৯৫৬ সালটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এই সময়টিতে সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তখন হিজরি সনটি ছিল ৯৬৩।

আর এই জন্য যে কোনো বছরে এসে বাংলা সনের হিসাব মিলে যায় এভাবে ৯৬৩+২০২৬-১৫৫৬=১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ আজ ১ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। বাংলা সনের প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, বাংলা সনকে কেন্দ্র করে যে ১লা বৈশাখের আয়োজন তার তাৎপর্য অন্যত্র নিহিত।

১ বৈশাখ বর্ষবরণ হয়ে থাকলেও চৈত্রের শেষ দিনটি খুবই উল্লেখযোগ্য। নতুন বছরকে বরণ করার মধ্য দিয়ে আমরা বর্ষবরণ করি। নতুন বছরের মাস বৈশাখ। আর পুরনো বছরের মাস চৈত্র। এই প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কনে দেখাকে নিয়ে গ্রামীণ গল্প।

গ্রামের কনে দেখা নিয়ে নানান গল্প রয়েছে। কনের বুদ্ধি পরীক্ষার জন্য একবার এক বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করে বসেন, এক বছরে রান্না করে তুমি আরেক বছরে কী করে খাওয়াবে!

বুদ্ধিমতী কনে জবাব দিয়ে দেয়—চৈত্র মাসের শেষের দিন রাঁধব আর পরের দিন বৈশাখ মাসে নতুন বছরে খাওয়াব। অর্থাৎ এক বছরের রান্না করে আরেক বছরে এইভাবেই খাওয়াবে।

প্রসঙ্গটি তুললাম এ কারণে যে বৈশাখের নতুন বছরের বর্ষবরণের সঙ্গে পুরনো বছরের চৈত্র মাসের একটি সংযোগ রয়েছে, যা সংস্কৃতিগত। সাংস্কৃতিক পারম্পর্যে। 

এক্ষেত্রে আমরা চৈত্রসংক্রান্তির কথা উল্লেখ করতে পারি। একে কেন্দ্র করে চৈত্র উৎসবে পরিণত হয়। আমরা বলতে পারি চাকমাদের প্রিয় বিজু উৎসবের কথা। বিজু অর্থ কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তি। চৈত্রকে সঙ্গে করেই বৈশাখের নববর্ষের যাত্রা। তাই আমরা প্রত্যক্ষ করি ‘বিজু’ উৎসব তিন দিনব্যাপী হয়ে থাকে। এই উৎসব চৈত্রকে বিদায় জানিয়ে বৈশাখের নতুন বছরকে বরণ। চৈত্রের শেষ দিন গৃহস্থরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করেন। নানান ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় দিনেই অনুষ্ঠিত হয় মূল বিজু। যেখানে যুবক-যুবতীরা নদীতে স্নান করে নতুন পোশাক পরে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নতুন বছরকে আনন্দ ও শান্তির সঙ্গে আহ্বান ও বরণ করে নেয় তারা।

বৈশাখকে অভিষেক জানানোর জন্য হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজের গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা চৈত্র মাসের শেষ দিন একটি হাঁড়িতে পানি এবং তার ভেতর অল্প পরিমাণ আতব চাউল রেখে দেন। তার সঙ্গে রাখেন কচি আমপাতার ডাল।

বৈশাখের ভোরের গৃহস্থবাড়ির মেয়েরা পাত্র থেকে আতব চাল খেতে দেন গৃহস্থকে; বাড়ির অনদের। তা ছাড়া আমপাতার পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয় গৃহস্থবাড়ির সবার শরীরে। এই পর্যায়টিকে ‘আমানি’ বলা হয়। শামসুজ্জামান খান যথার্থই বলেছেন, ‘আমানি ছিল মেয়েলি উৎসব, এর লক্ষ্য ছিল পরিবারের কল্যাণ ও পারিবারিক কৃষির সমৃদ্ধি কামনামূলক। এই পারিবারিক উৎসবের আচার সম্পন্ন করতেন বাড়ির মহিলাকর্ত্রী। কৃষি আবিষ্কারের নারীর পথিকৃতের ভূমিকা এবং তারই ফলে নারীতান্ত্রিক বা মাতৃতান্ত্রিক সমাজের স্মৃতিচিহ্নবাহী বলে কেউ কেউ এ আচারমূলক অনুষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করেন।’

আমানি স্থানীয় ও পারিবারিক-সামাজিক পর্যায়ের লোকাচার মূলক অনুষ্ঠান। ১ বৈশাখকে কেন্দ্র করে ‘আমানি’ পারিবারিক অনুষ্ঠানটির সূচনা কবে হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস নেই। তবে শুরুটা পুুণ্যাহ ও হালখাতার আগে প্রচলন হয়েছিল তাতে সংশয় নেই। ১ বৈশাখের লোকাচারের সংযোগটি ঘটেছে নতুন বছরের প্রথম দিনে গৃহস্থের শান্তি কামনায়। কৃষির সমৃদ্ধি কামনায়। লোকাচারটি যে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল তা দুটি কারণে হওয়া সম্ভব। ১. ‘আমানি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ আমপানীয় বা অম্লপানীয় প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে। শব্দের বিবর্তন নিয়ে মুহম্মদ এনামুল হক তার লেখায় উল্লেখ করেছেন—‘আমপানীয়  আমআনিয়  আমআনি  আমানি অর্থাৎ অসিদ্ধ (আম) চাউলজাত জল।

আমøপানীয় অম্মআনিঅ আমআনি আমানি, অর্থাৎ সিদ্ধ চাউলজাত টক পানীয়; পান্তাভাতের পানি, কাঁজি।’ এই যে ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করা, এ থেকে ‘আমানি’ সম্পর্কে মুহম্মদ এনামুল হকের বিশ্লেষণটি লোকাচারকে স্পষ্ট করে, ‘এখানে আমাদের ‘নববর্ষের’ ‘আমানির’ অর্থে প্রথম শব্দটি (আমপানীয়) প্রযোজ্য। এটা আদিমতম রীতির পরিচায়ক। দ্বিতীয় শব্দটি সভ্যতার পরবর্তী স্তরের। এই স্তরে মানুষ পাক করতে ও তাকে সঞ্চয় করে রেখে বাসি করে খেতে শিখেছে। সভ্যতার এ স্তরে আমাদের দেশের মানুষ ‘আমানি’ বা ‘কাঁজি’ খেয়েও ‘নববর্ষে’র উৎসবে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।’

‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানটির সূচনা ১ বৈশাখ। বাংলা সনের শুরু যে বৈশাখ এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় মুঘল শাসনামলেই বাংলার মুর্শিদাবাদ থেকে। বাংলা সন বিশ্লেষকদের অন্যতম শামসুজ্জামান খান যথাথই বলেছেন, ‘বাংলার নবাবেরা মর্শিদাবাদে ১ বৈশাখে পুণ্যাহ চালু করেছেন।’ পুণ্যাহ চালু হয়েছিল কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে। এটি আর আমানির মতো পারিবারিক ও সামাজিক রইল না। সর্বজনীন অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেল বৈশাখী উৎসবের বৈশাখী মেলা যে রকম সর্বজনীন। অভিধানে পুণ্যাহ অর্থ করা হয়েছে—১. পুণ্য কর্মানুষ্ঠানের দিন। ২. শুভদিনে বৎসরের খাজনা আদায় আরম্ভ অনুষ্ঠান। একটি পর্যায়ে বাংলা জমিদারদের কাছারিতে অনুষ্ঠিত হতো পুণ্যাহ।

কৃষকরা নতুন সাজে জমিদারের কাছারিতে আসতেন। জমিদারকে খাজনা দিতেন। পুরনো বছরের খাজনাই দিতেন প্রজারা। খাজনা দেওয়ার এই যে রীতি তা প্রাসঙ্গিকভাবে ‘পুণ্যাহ’ নামে ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়ায়।

মুহম্মদ এনামুল হক যথার্থই বলেছেন, ‘ঐদিন জমিদার-প্রজার সম্বন্ধের দূরত্ব খুব কমে আসত। তারা পরস্পর মিলিত হতেন, পরস্পরের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন, এমনকি পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতেন।’

পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানও খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটিও বৈশাখের অনুষ্ঠান হিসেবে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে হালখাতার আনুষ্ঠানিকতা সম্পৃক্ত। অসম্প্রদায়িক উৎসবের মধ্যে প্রাণের এবং বাঙালির মহামিলনের উৎসব বাংলা নববর্ষ। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা দেশ ছিল। ফলে গোটা বাংলাদেশটাই গ্রামজীবন ও সংস্কৃতিভিত্তিক পরিচালিত হতো। গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতি লোকসংস্কৃতি ধারা বিকশিত ছিল। বাংলা নববর্ষের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের লোকসংস্কৃতির প্রভাব এ কারণেই দারুণভাবে প্রতিফলিত। বাঙালি-হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবারই মিলনক্ষেত্র ছিল নববর্ষকে কেন্দ্র করে লোক-অনুষ্ঠানমালায়। এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। হালখাতা লোক-আচার-অনুষ্ঠানের অন্যতম উপাদান। আর এই হালখাতা অনুষ্ঠিত হতো নববর্ষকে কেন্দ্র করেই। হালখাতার আয়োজক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক আর নিমন্ত্রিত ব্যক্তিরা হলেন ক্রেতা। বিশেষ করে যেসব ক্রেতা সারা বছর বাকিতে সাংসারিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনে বাকিতে কোনো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থেকে বাকিতে দ্রব্যাদি ক্রয় করতেন তারাই।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান ‘হালখাতা’কে বছরের হিসাব-নিকাশ চুকানোর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নিরূপণ করেছেন—যা সবার কাছেই যথার্থ বলে মনে হবে। অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ নির্মল আনন্দেরও খোরাক পেত। তা ছাড়া সামাজিক মর্যাদারও এক্ষেত্রে প্রাধান্য পেত। শামসুজ্জামান খান যথার্থই বলেছেন, ‘শুধু অর্থনৈতিক অনুষ্ঠান বলেই এর গুরুত্ব বেশি ছিল তা নয়; এর সামাজিক গুরুত্ব ছিল অনেক।’ প্রসঙ্গটাকে তিনি আরও খোলাসা করেছেন এভাবে, ‘যিনি নববর্ষের হালখাতার দিনে দোকান বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধ করে হিসাব হালনাগাদ করতে পারতেন তিনি শুধু দোকান বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টিমুখ করেই ফিরতেন না—আত্মমর্যাদা ও গর্ব নিয়েও ফিরতেন। আর যিনি এই বকেয়া শোধ করতে অপারগ হতেন তার মর্যাদা ক্ষুন্ন হতো এবং তাকে লোকসমক্ষে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকতে হতো।’

হালখাতাকে কেন্দ্র করে মালিক শ্রেণি তিন ধরনের আনুষ্ঠানিকতার গুরুত্ব দিতেন।

এক. ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নানান আঙ্গিকে সাজসজ্জা। এই সাজসজ্জায় প্রতিফলিত হয় লোকশিল্পের নানা মোটিভ।

দুই. মিষ্টি মুখ করানো ও পান সুপারির আপ্যায়ন।

তিন. লোকগান। আর এই লোকগানে পরিবেশিত হতো বাউল গান, বিচার গান, কবি গান, কিচ্ছা গান প্রভৃতি।

বর্তমানে বৈশাখের ঐতিহ্যের স্থানীয়, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান ‘আমানি’ এবং সর্বজনীন অনুষ্ঠান ‘পুণ্যাহ’ ও হালখাতার আনুষ্ঠানিকতার বিলুপ্তি ঘটেছে।

তবে কোনো কোনো অঞ্চলে এখনো ‘আমানি’র অস্তিত্ব টিকে আছে। ‘পুণ্যাহ’ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব হালখাতাকে ফিরিয়ে আনা। যেখানে আচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল লোকসাংস্কৃতিক পরিবেশনা। 

লেখক : কবি ও ফোকলোর গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত