সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে বেশি পালক যাদের, সেই রিয়াল মাদ্রিদ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ৩৬ বারের লা লিগা জয়ী ক্লাবটি যখন ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি হয়, তখন ফুটবল বিশ্বে তা বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। চলতি মৌসুমে কোনো বড় ট্রফি না পাওয়ার জোরালো আশঙ্কায় এখন কাঁপছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। আর এই ব্যর্থতার দায়ভার কার কাঁধে পড়বে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। স্পটলাইটে এখন কোচ আলভারো আরবেলোয়া।
চলতি মৌসুমের শুরুটা হয়েছিল জাভি আলোনসোর হাত ধরে। প্রথম ১০ ম্যাচে বার্সেলোনাকে হারিয়ে ৫ পয়েন্টের লিড নিয়ে দারুণ শুরু করলেও, দ্রুতই খেই হারিয়ে ফেলে লস ব্লাঙ্কোসরা। জানুয়ারিতে স্প্যানিশ সুপার কাপে বার্সার কাছে হেরে আলোনসো পদত্যাগ করার পর দায়িত্ব নেন তার সাবেক সতীর্থ আরবেলোয়া। কিন্তু তার শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো; দ্বিতীয় বিভাগের দল আলবাসেতের কাছে হেরে কোপা দেল রে থেকে বিদায় নেয় রিয়াল।
এরপর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চেও ভাগ্য সহায় হয়নি। মিউনিখে বায়ার্নের বিপক্ষে হারের পর বিধ্বস্ত আরবেলোয়া যখন সংবাদ সম্মেলনে হাজির হলেন, তার চোখেমুখে ছিল ক্লান্তির ছাপ। ৪৩ বছর বয়সী এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে।
পেরেজের যুগে রিয়াল মাদ্রিদে ট্রফিহীন মৌসুম মানেই কোচের বিদায় ঘণ্টা। ২০০৪-০৫ থেকে শুরু করে ২০২০-২১ পর্যন্ত, যখনই রিয়াল বড় কোনো শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই কোচকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি বা জিনেদিন জিদান—কেউই এই কঠিন বাস্তবতা থেকে রেহাই পাননি।
তবে আরবেলোয়া অন্য ধাতুতে গড়া। হার মেনে নিয়েও তিনি সবসময় খেলোয়াড়দের আড়াল করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অকপটে বলেন, "পরাজয়ের জন্য আমিই দায়ী এবং আমি সবসময় এর পরিণাম ভোগ করতে প্রস্তুত। আমি এই ক্লাবের একজন একনিষ্ঠ মানুষ। নিজের চেয়ে আমি ক্লাব, খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের বেশি গুরুত্ব দেই। আমার লক্ষ্য কোচ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা নয়, বরং ক্লাবকে সাহায্য করা।"
রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান অবস্থা ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হতে পারে যদি তারা টানা দুই মৌসুম কোনো বড় শিরোপা ছাড়াই শেষ করে। লা লিগায় বর্তমানে বার্সেলোনার চেয়ে ৯ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে তারা। মে মাসে ক্যাম্প ন্যু-তে একটি এল ক্লাসিকো বাকি থাকলেও শিরোপা জয়ের আশা ক্ষীণ।
তবে ড্রেসিংরুমে আরবেলোয়া বেশ জনপ্রিয়। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সরাসরি বলেছেন যে আরবেলোয়ার সাথে তার সম্পর্ক ‘চমৎকার’ এবং তিনি চান কোচ থাকুক। ড্রেসিংরুমের মনোবল চাঙ্গা রাখতে আরবেলোয়া সফল হলেও, ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ সাধারণত ট্রফি ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হন না।
আপাতত মৌসুমের মাঝপথে আরবেলোয়াকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ হাতে পাওয়ার মতো খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে ২০২৬-২৭ মৌসুম পর্যন্ত তার চুক্তি থাকলেও, মৌসুম শেষে ট্রফিহীন রিয়াল মাদ্রিদে আরবেলোয়া টিকে থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। মাদ্রিদের তপ্ত ডাগআউটে টিকে থাকতে হলে কেবল ‘ম্যান অফ দ্য ক্লাব’ হওয়াই যথেষ্ট নয়, আলমারিতে ট্রফি তোলাটাও বাধ্যতামূলক।
মে মাসের এল ক্লাসিকো কি আরবেলোয়ার জন্য শেষ সুযোগ হবে, নাকি তার ভাগ্য ইতিমধ্যেই লেখা হয়ে গেছে? ফুটবল বিশ্ব এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
