ইসরায়েলের নিশানায় তুরস্ক-পাকিস্তান!

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৮ এএম

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘ ৪০ দিনের সংঘাত শেষে গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। নিজেদের সে ইচ্ছা না থাকলেও, সেই যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি হন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বিষয়ে ইসরায়েলি বিশ্লেষক বোয়াজ গোলানি এক চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছেন। ইসরায়েলি দৈনিক মাআরিভে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চিরশত্রু হিসেবে ইরানের জায়গা দখল করতে পারে তুরস্ক অথবা পাকিস্তান। ‘পরিবর্তনশীল বালুচর’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে গোলানি উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ হলে তেহরানকে ইসরায়েলের ‘প্রধান শত্রু’র তকমাটি ত্যাগ করতে হতে পারে। আর সেই শূন্যস্থান পূরণে এখন পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। গোলানি তার নিবন্ধে লিখেছেন, আলী খামেনির অধীনে ইরান গত তিন দশক ধরে এই ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে গোলানির দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ এবং দেশটির অর্থনৈতিক বিপর্যয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির সামরিক সক্ষমতাকে কার্যত ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের জন্য এখন নতুন কোনো ‘শত্রু রাষ্ট্র’ সামনে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা : এই দৌড়ে তুরস্ক ও পাকিস্তান এগিয়ে থাকার পেছনে বোয়াজ গোলানি বেশ কিছু মিল খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতাটি মূলত তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তুরস্কের জনসংখ্যা ৮.৫ কোটি এবং পাকিস্তানের ২৪ কোটি। উভয় দেশই সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সেখানে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল কর্র্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে। গাজায় চলমান গণহত্যা এবং সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। এক্সে এক পোস্টে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে আক্রমণ করে বলেছেন, এরদোয়ান নিজের কুর্দি নাগরিকদের গণহত্যা করছেন এবং ইরানের সন্ত্রাসী শাসন ও তাদের প্রক্সিদের মদদ দিচ্ছেন। নেতানিয়াহুর এই আক্রমণাত্মক বার্তার পেছনে আঙ্কারার সঙ্গে গ্রিস ও সাইপ্রাসের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। পাল্টা আক্রমণে নেতানিয়াহুকে ‘গাজা গণহত্যা’র বিষয়টি মনে করিয়ে কড়া বার্তা দেয় তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার কথাও ব্যঙ্গাত্মক সুরে তুলে ধরা হয়। অবশ্য গোলানি এও উল্লেখ করেছেন, তুরস্কের এমন বিরোধিতার সত্ত্বেও গ্রিসের শ্যাডো শিপ বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত জাহাজ এখনো তুরস্কের জেহান বন্দর হয়ে ইসরায়েলে তেল ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দিচ্ছে।

পাকিস্তানের অবস্থান-সমালোচনা : ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তান বরাবরই ইসরায়েলের কড়া সমালোচক; দেশটিতে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব দীর্ঘদিনের। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক এক্স পোস্টে ইসরায়েলকে ‘শয়তান’ এবং ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেন। যদিও পরবর্তীতে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। নিবন্ধের শেষে গোলানি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই অবসান হওয়ার পরপরই এ দুই দেশের যেকোনো একটির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েলকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এদের মধ্যে কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ আমাদের হাতে নেই এবং উভয় বিকল্পই আমাদের জন্য সমান খারাপ। এই দেশগুলোকে মোকাবিলা করার একমাত্র প্রধান হাতিয়ার হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, যা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করতে হবে।

শান্তিচুক্তিতে লাগতে পারে ৬ মাস : উপসাগরীয় আরব ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কিছু নেতা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি হতে অন্তত ছয় মাস লাগবে। এ সময়ের জন্য উভয় পক্ষের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো উচিত বলে তারা মনে করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বাস করে যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে এবং তাদের সেই লক্ষ্য বদলায়নি। তাই তারা মনে করেন, শান্তিচুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত। তবু উপসাগরীয় নেতারা নতুন করে যুদ্ধের পক্ষে নন এবং তারা চান যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাক। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন সরকারের মুখপাত্ররা ব্লুমবার্গের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত