পিরোজপুরের আটঘর-কুড়িয়ানা

ভাসমান পেয়ারা হাট, খালের বুকে ভাসে সবুজ-হলুদের স্বপ্ন

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

খালের বুকজুড়ে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পানির ওপর ভেসে আছে সবুজ-হলুদের বিশাল ক্যানভাস। পেয়ারার ভরা মৌসুমে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মেলে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানায়। দেশের পরিচিত এই ভাসমান পেয়ারা হাট এখন কৃষি, অর্থনীতি ও পর্যটনের এক অনন্য মিলনস্থল।

সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর-কুড়িয়ানা খাল ঘিরে গড়ে ওঠা এ হাটে ভোর থেকেই শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ আশপাশের গ্রামের চাষিরা ছোট ছোট ডিঙি ও নৌকায় করে বাগানের পেয়ারা নিয়ে আসেন। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খালের বুক ভরে যায় পেয়ারা বোঝাই নৌকায়। এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় চলে দরদাম। পাইকাররা পেয়ারা কিনে বড় নৌকা ও ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয়দের মতে, এ ভাসমান পেয়ারা হাট এখন শুধু কৃষিপণ্য কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের অন্যতম স্থান। পেয়ারার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ছুটে আসেন। নৌকা ও ট্রলারে করে তারা ঘুরে দেখেন খালের দুই পাড়ের পেয়ারা বাগান। খালের পানিতে সারি সারি নৌকা, নৌকাভর্তি পেয়ারা আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে হাটের ব্যস্ততা। কোথাও কৃষক পেয়ারা বিক্রির অপেক্ষায়, কোথাও পাইকারদের সঙ্গে চলছে দরদাম। আবার কেউ বিক্রি করা পেয়ারা নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। অনেক কৃষক পেয়ারা বিক্রি করে প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করে বাড়ি ফিরছেন। ফলে হাটকে কেন্দ্র করে পেয়ারা বেচাকেনার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

পেয়ারার আকার, স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় নেছারাবাদের পেয়ারার চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এ অঞ্চলের পেয়ারার বাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে। কৃষক দ্রুত পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন, আর ব্যবসায়ীরাও কম সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা পাঠাতে পারছেন।

পেয়ারা চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে হাটে প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা কেনাবেচা হচ্ছে। প্রতি মণ পেয়ারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হয়।

বাগেরহাটের সাইনবোর্ড বাজার থেকে পেয়ারা কিনতে আসা ৭৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, ‘স্বাধীনতার আগ থেকে আমি এই এলাকার পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করছি। এ এলাকার পেয়ারার স্বাদ ও মান খুব ভালো। বাংলাদেশে এমন পেয়ারা আর কোথাও হয় না।’

স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী সুজন সিকদার বলেন, এ বছর আবহাওয়া কিছুটা খারাপ থাকায় পেয়ারা উৎপাদন কম হয়েছে। তবে বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষকরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন।

পেয়ারা চাষি দেবাশীষ রায় বলেন, ‘আমার ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ রয়েছে। খুব ভোরে বাগানে গিয়ে পেয়ারা আহরণ শুরু করি। আহরণ শেষে নৌকায় করে হাটে নিয়ে এসে বিক্রি করি। পেয়ারা চাষ ও বাজারজাতকরণে অনেক শ্রম দিতে হয়। তবে ভালো দাম পেলে সেই পরিশ্রম সার্থক হয়।’

পেয়ারা হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। পেয়ারা আহরণ, পরিবহন, নৌকা চালানো, বাগান পরিচর্যা, প্যাকেজিং ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অনেক মানুষ। বিশেষ করে মৌসুমে স্থানীয় যুবকদের একটি অংশ পেয়ারা পরিবহন ও বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয় করছেন।

পেয়ারার হাটকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। পর্যটকদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো। স্থানীয় খাবারের মধ্যে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংস পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে পেয়ারা বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও গড়ে উঠছে।

ঢাকা থেকে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী জুলিয়া তাবাসসুম বলেন, ঢাকার ইট-পাথরের শহর থেকে বের হয়ে পরিবারের সঙ্গে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারা আনন্দ করছে। ভাসমান পেয়ারা হাট ও ছোট ডিঙি নৌকায় ঘুরে ঘুরে পেয়ারা বাগান দেখছি। এখানকার সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ।

পিরোজপুর থেকে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী পংকজ চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে তিনি এখানে আসেন। ভাসমান নৌকায় পেয়ারা নিয়ে খালের ভেতর দিয়ে চলাচলের দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, উপজেলার পর্যটনব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলার মধ্যে নেছারাবাদেই সবচেয়ে বেশি পেয়ারা চাষ হয়। জেলায় প্রায় ৭১০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা আবাদ হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে এই পেয়ারা হাটে ২০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পেয়ারা কেনাবেচা হয়।

তবে সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব এখানকার বড় সমস্যা। পচনশীল ফল হওয়ায় পেয়ারা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেয়ারা বাজারে ওঠায় অনেক সময় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন।

স্থানীয় পেয়ারা চাষি মহসিন হাওলাদার বলেন, পেয়ারা পচনশীল মৌসুমি ফসল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে দ্রুত পচে যায়। তখন বাধ্য হয়ে স্বল্প দামে বিক্রি করতে হয়। এ এলাকায় একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ থাকলে পেয়ারা সংরক্ষণ করে পরে ন্যায্য দামে বিক্রি করা সম্ভব হতো। এতে চাষিরা লাভবান হতেন।

চাষিদের দাবি, আটঘর-কুড়িয়ানায় একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষককে কম দামে পেয়ারা বিক্রি করতে হবে না, বাজারে সরবরাহও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। পাশাপাশি পেয়ারা চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে।

সবুজ বাগান, খালের পানি, পেয়ারা বোঝাই নৌকা আর ব্যস্ত বেচাকেনা—সব মিলিয়ে নেছারাবাদের আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট এখন কৃষি, অর্থনীতি ও পর্যটনের এক অপূর্ব মিলনস্থল। পেয়ারার মৌসুমে এ হাট যেমন ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করে, তেমনি হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ীর জীবিকার পথ তৈরি করে। তাই মৌসুম এলেই আটঘর-কুড়িয়ানা যেন হয়ে ওঠে প্রকৃতি ও অর্থনীতির জীবন্ত সবুজ-হলুদের ক্যানভাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত