জিহাদ ও কুটকুটির গল্প

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪১ এএম

জিহাদ ক্লাস টুতে পড়ে। বয়স ছয় বছর। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। খুব কথা বলে। মনে হয় খই ফুটছে। পাক্কা বুড়ো। শুধু শুনতেই মন চায়। ক্লাসে নিয়মিত। পড়াশোনায় ভালো। হাতের লেখা খুব সুন্দর। মনে হয় টাইপ করা। সেজন্যই তো জিহাদকে সবাই অনেক অনেক আদর করে।

একদিন জিহাদ ক্লাস করে মায়ের সঙ্গে বাসায় এলো। হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের সঙ্গে ছাদে উঠল।

বৈশাখ মাস। রঙিন আকাশ। ফুরফুরে বাতাস। তাই ছাদে বেশ সময় নিয়ে বসে আছে মা ও ছেলে। বৈশাখ নিয়ে মায়ের সঙ্গে গল্প করছে জিহাদ। গ্রীষ্মের ছুটিতে কোথায় ভ্রমণে যাবে, কী করবে, কত্ত

রকম খুনসুটি!

হঠাৎ করেই জিহাদ দেখতে পেল ছাদের এক কোণে একটা ইঁদুর ছানা। চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে।

তাড়াতাড়ি কাছে গেল। দেখল আশপাশে ছানাটির মা আছে কিনা। কোথাও ইঁদুর ছানার মাকে দেখতে পেল না। জিহাদের মা আর খেয়াল করলেন না ছেলে কী করছে।

জিহাদ ছানাটিকে নিয়ে নিচে নেমে এলো। অনেক যত্ন করে কেক খাইয়ে দিল। বিছানায় শিমুল তুলোয় জড়িয়ে রাখল। ছোট্ট কুট্টি ইঁদুর ছানা যাবে কোথায়? জিহাদ তাই তাকে নিজের কাছেই রেখে দিল। ছানাটির নাম রাখল কুটকুটি।

মা-বাবা দেখে জিহাদ ইঁদুর ছানাটি দেখে কিছুই বলল না। অবলা একটা প্রাণীকে যত্ন করছে। তারা খুশিই হলো।

বেশ কয়েক দিন পর ছানাটি আর ছানা রইল না। বেশ বড় হয়ে গেছে। জিহাদ ক্লাস করে এলেই কুটকুটি পায়ের কাছে চলে আসে। জিহাদও নিয়মিত কেক, বিস্কুট, ড্রিংকো নিয়ে আসে কুটকুটির জন্য।

কুটকুটি বলে ডাক দিলেই পিল পিল করে ছুটে আসে জিহাদের কাছে।

এতটাই ভালোবাসা।

হঠাৎ একদিন রান্না ঘরের অবস্থা দেখে মায়ের রাগারাগি।

‘দেখছো জিহাদ, দিন দিন কুটকুটি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রান্নাঘরের  পেঁয়াজ, আলু কেটে শেষ করেছে। সঙ্গে মাছগুলোও নষ্ট করেছে। ওকে তাড়িয়ে দাও? ও আমাদের শুধু এখন ক্ষতি করছে।’

কুটকুটির চোখ দেখে জিহাদ বুঝতে পেরেছে এসব কুটকুটি করেনি। এটা ওই দুষ্টু বিড়ালের কাজ। কিন্তু মাকে বোঝাতে

পারছে না।

জিহাদের মনটা খুবই খারাপ হলো। কুটকুটি জিহাদের কোলে উঠে বসল। কুটকুটির মাথায় হাত বুলিয়ে জিহাদ চিন্তা করতে লাগল। কুটকুটির প্রতি ভালোবাসা বাসার সবার কমে গেছে। সবাই বলছে দূরে কোথাও রেখে আসতে।

কিন্তু জিহাদ নাছোড়বান্দা। রাখবে মানে রাখবে। বন্ধুত্ব কী এত সহজ।

জিহাদের দৃঢ়বিশ্বাস, এসব কুটকুটি করতেই পারে না।

দুষ্ট বিড়ালের উৎপাত বেড়েই চলেছে। এদিকে জিহাদকে বাসার সবাই বকাবকি করছে।

বাবা অবশেষে বলল, ‘কালকেই দূরে কোথাও রেখে আসব। আর সহ্য হয় না।’

জিহাদের চোখে জল টলমল করছে।

হঠাৎ রান্নাঘর থেকে কুটকুটির চিক, চিক করে শব্দ শোনা গেল। সঙ্গে থালাবাসনেরও ঝনঝনানি শব্দ। রাগে মা-বাবা দৌড়ে গেল। জিহাদও এলো।

সবাই দেখতে পেল রান্নাঘরে ওই দুষ্টু বিড়ালটা দুধের বাটি ঢেলে ফেলে দিয়েছে। মাছ খেয়ে কাঁটাগুলোও ফেলে দিয়েছে মেঝেতে।

জিহাদ বলল, ‘দেখলে মা, তোমাকে বলছিলাম না আমাদের কুটকুটি এসব করেনি! আমি তো কুটকুটির চোখের ভাষা বুঝতে পারি। প্রথম দেখেই আমি বুঝেছি কুটকুটি এসব করেনি। দেখলে তো এসব দুষ্টু বিড়ালের কাজ।’

সবাই নিজেদের ভুল বুঝতে পারল। বাসার সবাই বলল, ‘আমরা বুঝতে পারিনি জিহাদ। আমাদের ভুল হয়েছে। আমাদের ওপর মন খারাপ করো না!’

জিহাদের চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছে। কুটকুটিও বুঝতে পেরেছে। তারপর থেকে কুটকুটি বাসায় সবসময় খেয়াল রাখে। কেউ ক্ষতি করতে এলেই জোরে, জোরে ‘চিক, চিক, চিক’ শব্দ করতে থাকে।

আর বাড়িতেও কুটকুটির আদর আগের থেকে অনেক অনেক বেড়ে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত