দুটি রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘কেউ প্রকাশ্যে ও কেউ গোপনে এখনো ষড়যন্ত্র করছে। তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করুন।’ গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপি আয়োজিত কর্মী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। জনগণ আমাদের যেভাবে সমর্থন করেছে সেই সমর্থন ধরে রাখুন।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলীয় কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন মাসের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করুন কীভাবে জনগণের কাছে আরও যাওয়া যায়। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে চলবে না। দলীয় এমপিদের গ্রুপিং রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা দলের কর্মীদের অমুকের লোক, তমুকের লোক বলবেন না। এতে বিভক্তি বাড়বে।
অতীত আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকার বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। কষ্ট করেছেন। পরিবারের জন্য যে রকম মায়া আছে, দলের জন্যও তেমনি রয়েছে। আপনাদের আচরণে যাতে কারও মন খারাপ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে সিলেটে যান। সিলেট সফরে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। বিকেলে দলীয় কর্মিসভায় বক্তৃতা শেষে সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর
প্রধানমন্ত্রী গতকাল দুপুরে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে সিটি করপোরেশন আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বন্ধ কলকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা হবে। যাতে মানুষ কাজ করে, খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকার সদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল শনিবার দুপুরে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে সিটি করপোরেশন এ সুধী সমাবেশের আয়োজন করে।
দেশের মানুষকে ভালো রাখতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস। তবে এ অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার অন্তত ভালো কাজের সূচনা করতে পেরেছে। এ কাজগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশ এ কথা মাথায় রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নানা কারণে আমাদের জলবায়ু ও পরিবেশ আজ বিপন্ন। অসময়ে প্রবল বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহসহ হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরে নিত্যপ্রয়োজনে এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষি কাজের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি টেনে তোলায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এতে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। তাই আমরা প্রাকৃতিক জলাধার বাড়াতে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশবাসী সুফল পাবেন বলে আমরা আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রী নগর-শহর এলাকায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তিনি সিলেট-ঢাকা সড়ক যোগাযোগের করুণ অবস্থা তুলে ধরে বলেন, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সড়কপথে সিলেট থেকে ঢাকা যেতে আরও বেশি সময় লাগে। এ সড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে রেলপথ সম্প্রসারণ ও রেলপথের উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি সিলেট-ঢাকা রেললাইনকে ডাবল লাইনে উন্নীত করারও প্রতিশ্রুতি দেন।
দেশের চিকিৎসাসেবা উন্নত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সামর্থ্যরে চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। যার ৮০ শতাংশই নারী কর্মী। এই কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সুস্থ থাকার পরামর্শ দেবেন।
সিলেটসহ সারা দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সরকার দেশি-বিদেশি বিনোয়োগ আনতে কাজ করছে। সিলেটে নির্মিত আইটি পার্ক কার্যকর করারও প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুুন কবির, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বিমানপথে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে গিয়ে মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় সড়কের দুপাশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীকে স্লোগানে স্লোগানে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছা জানান।
বাসিয়া নদী পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন
সুধী সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদী পুনর্খনন কাজ উদ্বোধন করেন। এ সময় সেখানে আয়োজিত সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য সব বন্ধ কারখানা চালু করা হবে। বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, সারা দেশে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করব। আমরা শুরু করেছি। আজ (শনিবার) এই বাসিয়া খাল পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন করলাম।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার ‘খাল কাটা কর্মসূচির’ আওতায় সর্বশেষ এ নদীটি খনন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর তার সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে নদীটি পুনরায় খনন হচ্ছে।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস উদ্বোধন
বিকেল ৪টার দিকে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ এ স্লোগান সামনে রেখে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে একটি লাল বাটন চেপে ট্রফি ও লোগো উন্মোচনের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সারা দেশের জেলা স্টেডিয়ামগুলোতেও এ সময় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন খুদে ক্রীড়াবিদরা।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে বলেন, দেশকে একদিন তোমরাই নেতৃত্ব দেবে। মন্ত্রী, এমপি হবে তোমরাই। তবে তার আগে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও অংশগ্রহণ করতে হবে। যে যেটা ভালো পার, তাকে সেটা ভালোভাবেই করতে হবে। তোমাদের সবাইকেই বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমাদের সবাইকে নিজেদের লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জনের জন্য এগিয়ে যেতে হবে। আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্যোগ আমরা নিয়েছি, কারণ তোমাদের মধ্য থেকেই দেশের আগামী দিনের বড় বড় ক্রীড়াবিদরা উঠে আসবে। তোমাদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও অংশগ্রহণ করতে হবে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের এ দেশটা একসময় পরাধীন ছিল। যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। তারপর আরও অনেক ঘটনা প্রবাহের পর ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে আবার স্বাধীন করে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালিক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শাম্মি আখতার প্রমুখ।
