কালো কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। ভয়, আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে মানুষগুলোকে। গতকাল বুধবার রাজধানীর মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নীরব কণ্ঠে মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন ছয়টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা। মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা বলেন, কষ্টার্জিত টাকা এখনই ফেরত চাই। আমার সঞ্চয়ে আমার অধিকার নাই। চিকিৎসা, শিক্ষা সংসার-সব থেমে আছে। টাকা নাই। আমানত ছিল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, আর তা এখন দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে গেছে।
মানববন্ধনের আয়োজন করেছে ‘অ্যালায়েন্স ফর সিক্স এনবিএফআই ডিপোজিটর্স ফর রিকভারি।’ সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব এনবিএফআইয়ে প্রায় ১২ হাজারের বেশি আমানতকারীর কষ্টার্জিত অর্থ দীর্ঘ সাত বছর ধরে আটকে আছে। ফলে তারা চরম আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ ও মানবিক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৯টি ব্যাংক– বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও পরে তালিকা থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফিন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
ভুক্তভোগীরা জানান, অনেক আমানতকারী ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগসহ গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এমনকি চিকিৎসা না পেয়ে কয়েকজন আমানতকারীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
সংগঠনটির প্রতিনিধি জাকির উল্লাহ খান মানববন্ধনে বক্তৃতায় বলেন, ‘আমরা সাত বছর ধরে আমাদের ন্যায্য অর্থ ফেরতের জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো সমাধান পাইনি। আমাদের অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারছেন না, পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরতের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব বহন করে। তাই আমরা গভর্নরের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
আরেক আমানতকারী প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের অনেকের জীবন-জীবিকা এই টাকার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বছরের পর বছর ধরে আমরা অনিশ্চয়তায় আছি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।’
পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলো হলো, ঘোষিত জুলাই ২০২৬ সময়সীমার মধ্যে আমানত ফেরতের জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গভর্নরের সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ প্রদান।
স্মারকলিপিতে আমানতকারীরা আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত, কার্যকর ও মানবিক উদ্যোগ নিয়ে এই সংকট সমাধানে এগিয়ে আসবে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারের পক্ষ থেকে অবলোপনের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলে তা পরিশোধ করা হবে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খেলোয়াড়দের বোনাস প্রদানের মতো বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে, নিকট ভবিষ্যতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর আগে টাকা ফেরত চেয়ে গত ১৬ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে অ্যালায়েন্স ফর সিক্স এনবিএফআই ডিপোজিটর্স ফর রিকভারি। সেদিন তারা বলেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমানতের অর্থ ফেরত পেতে সুস্পষ্ট পথনকশা প্রয়োজন।
এ ছাড়া এই ছয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের পদক্ষেপ দাবি করেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা।
