অজ্ঞাত এক নারীর আপত্তিকর ছবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ছবি! ক্যাপশন ‘অনেক দিন পর বান্ধবীর সঙ্গে দেখা’! কী ভাবছেন? ঘটনাটি সত্য? না মোটেও সত্য না। এডিট করে এই আপত্তিকর ছবিটি একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়। শুধু তাই নয়; সেই ছবি নিজের ফেসবুক আইডিতেও শেয়ার করেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার আজিজুল হক। বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের নজরে এলে তারা প্রতিবাদ জানান। পরে আজিজুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাকে গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পক্ষ নিয়ে সরব হয় সরকারের প্রতিপক্ষ। এটাকেও দাবি করা হয় বাকস্বাধীনতা হিসেবে। একটি দুটি ঘটনা নয়; অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কখনো আক্রান্ত হচ্ছেন সরকারপ্রধান, সিনিয়র মন্ত্রী, এমপি, কখনো আবার বিরোধী দলের নেতারাও। বাদ যাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। এআইর যুগে মিথ্যা ছবি তৈরি করা এখন ডাল-ভাত। প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে কিংবা পোস্ট করে গালি দেওয়া, কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার, মিথ্যা ছবি এবং অপতথ্য প্রকাশ হরহামেশাই হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে এটাও ‘বাকস্বাধীনতা’। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের প্রবণতাকে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগের লক্ষণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেটিকে বলা হয় ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’। আর এই মানসিক রোগের কিছু কিছু সমস্যায় ভুগছেন দেশের অসংখ্য মানুষ। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সংশ্লিষ্টরা নিজেরাও জানেন না তারা অসুস্থ। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর যারা গুজব বা অপতথ্যের শিকার হচ্ছেন তারাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন আরও মারাত্মকভাবে। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, এমনকি বিষণœতার মতো সমস্যাও। সামাজিক আস্থার কাঠামোও দুর্বল হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে ‘গুজব’ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলে কারও বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সম্মানহানি করা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠীতে কিংবা এলাকাভিত্তিক দাঙ্গা বেধে যায়। ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়। মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
প্রতিনিয়তই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ গুজবের শিকার হচ্ছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশে এবং দেশের বাইরে বসে একটি চক্র এটা করছে। এছাড়া কিছু সংবাদমাধ্যমে তথ্য যাচাই না করে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের আদলে কার্ড বানিয়ে ভুয়া তথ্যও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফর নিয়েও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিপক্ষ তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে টার্গেট করে গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরিতে লিপ্ত রয়েছেন। শুধু তাই নয়; প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংকেও বিতর্কিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। রক্ষা পাচ্ছেন না সংবাদিকরাও। এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খোঁজা হচ্ছে সমাধানের পথও। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
তবে কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজের সঙ্গে সাক্ষাতে তথ্যমন্ত্রী ইউনেস্কোর কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে অপতথ্য, ভুল তথ্যের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর ‘রোডম্যাপ’ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২৭ এপ্রিল সকালে সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘অপতথ্য ও ভুল তথ্য সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এটি এখন যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও নানা গুজব ছাড়ানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়। টিকা রোগ প্রতিরোধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি নিয়েও গুজব ছড়ানো হয়। গুজবের কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। গুজবের শিকার হয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও। ইসলামে গুজব একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি বলা হলেও ইসলামি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুজবে লিপ্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, গুজব ছড়ানো এক ধরনের অপরাধ। যারা গুজব ছড়ান তারা অপরাধ করেন। সব ধর্মেও এ বিষয়ে নিষেধ আছে। যারা গুজব ছড়ায় তারা যে শুধু ‘অ্যান্টিসোস্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’-এর রোগী শুধু তাই নয়। তবে ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’ রোগীদের মধ্যে গুজব ছড়ানোর প্রবণতা বেশি থাকে। তাদের মধ্যে যে রকম নির্মমতা নিষ্ঠুরতা বেশি থাকে তেমনি গুজব ছড়ানোর প্রবণতাও বেশি থাকে। গুজব সরিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়। এ ছাড়া যারা গুজবের শিকার হন, তাদের ওপরও খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই মানুষটি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেয় হন। অপমান-লজ্জায় মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, ‘কারে বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য বা বিকৃত ছবি ছড়ানো হলে ভুক্তভোগী তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বেগ, এমনকি বিষণœতায় ভুগতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে আত্মসম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যায়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার, চরিত্র হনন, এসব শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই করে না, বরং সামাজিক আস্থার কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়। গুজব অনেক সময় বাস্তব সহিংসতায় রূপ নেয়। গুজবের কারণে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা গণপিটুনির মতো ঘটনাও ঘটে।’
কিছুদিন আগে তোলপাড় হয় ভোলার এক নারী গ্রেপ্তারের ঘটনায়। তিনি ফেসবুকে নানা আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছিলেন। পরদিন ওই নারী জামিনে মুক্ত হন। তার গ্রেপ্তার নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ সোচ্চার হলেও বিভিন্ন সময়ে তার দেওয়া আপত্তিকর পোস্ট নিয়ে কেউ কথা বলেননি।
ডা. মুনতাসীর মারুফ আরও বলেন, ‘অনেকে ভাইরাল হওয়ার জন্য বা গুরুত্ব পাওয়ার জন্য গুজব ছড়ান। ডিজিটাল লিটারেসির অভাব থাকায় অনেকে যাচাই না করেই তথ্য শেয়ার করে। নিজের রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শকে সমর্থন করতে ইচ্ছাকৃতভাবেও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। অনলাইনে নিজের পরিচয় আড়াল করা যায় বলে অনেকেই বাস্তব জীবনের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকেও অপপ্রচার করা হয়। যারা গুজব ছড়ান তাদের কেউ কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। তবে সব গুজব ছড়ানো মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন, এটা বলা ঠিক হবে না। কিছু ক্ষেত্রে, নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বা অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের মতো ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা থাকলে সহানুভূতির অভাব বা অন্যকে ক্ষতি করার প্রবণতা বেশি থাকতে পারে।’
স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন জার্নাল থেকে জানা গেছে, অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার একটি মানসিক সমস্যা। এ ধরনের ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদে অন্যের অধিকার, সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার প্রতি অবহেলা বা লঙ্ঘনমূলক আচরণ করেন। নিয়ম-কানুন ভাঙার প্রবণতা, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, হঠকারী ও দায়িত্বহীন আচরণ, আক্রমণাত্মকতা বা সহিংসতা, অপরাধবোধ বা অনুশোচনার অভাব থাকে। এটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে নির্ণয় করা হয়, তবে এর লক্ষণ শৈশব বা কৈশোর থেকেই শুরু হতে পারে। অবহেলা, নির্যাতন বা অসামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় এই মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে দেশে এই রোগীর সংখ্যা কত তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। ২০১৬-১৮ সালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে পারসোনাল ডিজঅর্ডারের রোগীদের এবং ২০১৫-১৬ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে ওসিডি রোগীদের নিয়ে গবেষণা চলানো হয়। অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার নিয়ে দেশে তেমন কোনো গবেষণা নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছেন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সংবিধানে যেটা আছে, বাকস্বাধীনতা সেই পর্যন্তই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কিংবা তাদের মনে কোনো আঘাত লাগেÑ এ জাতীয় কথা বলবেন না। আরেকজনের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো এটা তো সাংবিধানে নেই।’ তার মতে এটা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল, তবে সমাধান খুঁজতেই হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি এটা এক ধরনের ষড়যন্ত্র। সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু এআই দিয়ে ম্যানুপুলেট করে চরিত্র হনন করা এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। এগুলো যারা করেন, এরা খুবই হীনমন্য এবং পরশ্রীকাতর ব্যক্তি বলে আমার কাছে মনে হয়।’
ইসলাম কী বলে?
মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা ছড়িয়ে দেওয়া, সমাজে বিভ্রান্তি, ফিতনা ও সম্পর্কের অবনতি ঘটায়, ইসলাম এমন কাজকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও’। সুরা আন-নূর-এর ১৯ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক তা পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি রয়েছে’। এ আয়াতে গুজব ছড়ানোকে অশ্লীলতা ও ফিতনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘গুজব থেকে বাঁচার ইসলামের নির্দেশনা হলো, খবর যাচাই করা, সত্য ছাড়া কিছু না বলা, অন্যের সম্মান রক্ষা করা, অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা, ভালো কথা বলা বা চুপ থাকা। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’
