চার পা এগিয়েছি পাঁচ পা পিছিয়েছি

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৭ এএম

বিশিষ্ট নারী অধিকারকর্মী শিরীন পারভিন হক চার দশকেরও বেশি সময় নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গসমতা, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত। নারী অধিকারবিষয়ক নাগরিক সংগঠন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশে নারীর অবস্থান এবং রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে।

প্রশ্ন : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আপনার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি জানতে চাই।

উত্তর : প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। আমার প্রজন্ম যা পারল না, আমার পরের প্রজন্ম যা পারল না, তার পরের প্রজন্ম করে দেখিয়ে দিল। স্বৈরশাসনের পতন ঘটাল। শুধু পতনই ঘটাল না, শাসককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করল। আমি আপ্লুত ছিলাম। কষ্টও পেয়েছি যে, এতগুলো মানুষ, এতগুলো ছেলেমেয়ে রক্ত দিল। আবু সাঈদের হত্যা পুরো আন্দোলনের বাঁক বদলে দিল। ৯ দফা দাবি থেকে এক দফায় চলে এলো। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মেয়ে বলেছিল, ‘আমাদের আর পিছে ফেরার সুযোগ নেই। পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা।’ ওই দুইটা কথায় কিন্তু মেয়েটি সব বলে দিল। কথাটি আমার খুব মনে ধরেছিল।

প্রশ্ন : এখন কী অবস্থা?

উত্তর : এখন যখন শুনি আগেই ভালো ছিলাম, তখন দুঃখ, কষ্ট ও রাগ হয়। আমরা তাহলে কোথায় ভুল করলাম, কোথায় ব্যর্থ হয়ে গেলাম? ওরা তো অর্জন করে দিল। তাই ব্যর্থতার দায় ওদের না, আমাদের। কিন্তু ব্যর্থতার কথা যখন ভাবি তখন মনে হয় অনেকগুলো ব্যাপার ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যখন বলল, মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের জন্য কোটা হবে নাকি রাজাকারের নাতিপুতিদের জন্য। এটা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঝরাতে রোকেয়া হলের ফটক ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে এলো। স্লোগান দিতে শুরু করল ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার।’ তারও কিছুক্ষণের মধ্যে যোগ হলো ‘কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ একজনের মুখের গালিকে টেনে নিয়ে সেটাকে প্রতিবাদের  অস্ত্র এবং শক্তি হিসেবে ব্যবহার করল!

প্রশ্ন : যেই মেয়েরা এত সাহস দেখাল, তারা কোথায় গেল?

উত্তর : আমার কাছে এর কোনো সহজ উত্তর নেই। নারীপক্ষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা কিছু মেয়ের সঙ্গে একটি ঘরোয়া আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অনেকে বলেছে, আমরা তো এখনো শিক্ষার্থী। লেখাপড়ায় ফিরে যেতে চেয়েছি। আবার কেউ কেউ বলল, আমাদের জায়গা দেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন : তরুণরা যে স্বপ্ন দেখাল, সেই জায়গা থেকে কি তারা সরে গেল?

উত্তর : আমার মনে হয় তারা সরে গেল। আপনার প্রথম প্রশ্নে যদি ফিরে যাই যে প্রত্যাশাটা কী ছিল? প্রত্যাশা তো ছিল বিশাল, সীমাহীন। এখন যখন বিশ্লেষণ করি, মনে হয় তাদের কাছে এত আশা করা বোধহয় অনুচিত ছিল। ৮ তারিখে যখন সরকার গঠন করা হলো, তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস বললেন, ছাত্ররাই তাকে এ জায়গায় বসিয়েছে। এরাই তার নিয়োগকর্তা। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। উপদেষ্টা পরিষদে শিক্ষার্থীদের নেওয়া, ওই সময় মনে হয়েছিল সঠিক পদক্ষেপ। যুবকদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের চাওয়া-পাওয়া নীতিনির্ধারণের টেবিলে আসা উচিত। যেটা ভালো লাগেনি, উনি দুজন শিক্ষার্থী নিলেন, দুজনই পুরুষ। অথচ দেখেন, প্রথম বের হলো কারা? মেয়েরা। তো সেটা আমাকে আশাহত করেছিল। এখন মনে হয় বেশি ভালো হতো, উনি যদি বলতেন, ‘বাবারা, মায়েরা তোমরা বিশাল কাজ করেছ। তোমাদের অনুরোধে আমি হাল ধরছি; এখন তোমরা তোমাদের লেখাপড়ায় ফিরে যাও।’ এরা হুট করে ক্ষমতা পেয়ে গেল। রাজনৈতিক দলে একটা মানুষ জাতীয় পর্যায়ে নেতা হতে গেলে তাকে কিন্তু অনেক দিন দলের ভেতরে বহু চর্চার মধ্য দিয়ে, অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক ধরনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যেতে হয়। আর এরা বিনা প্রস্তুতিতেই হঠাৎ ক্ষমতা পেয়ে গেল। সেই ক্ষমতা পেয়ে তাদের কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হয়ে গেল। এখন যেগুলো পত্র-পত্রিকায় পড়ি, বিশ্বাস করতে চাই না। এদের তিনজন তো আমাদের হাসপাতালেই ছিল। ওখান থেকেই তো ডিবি তাদের উঠিয়ে নিয়ে গেল। তখন আমার সুযোগ হয়েছিল ওদের খুব কাছে থেকে দেখার। মনে হয়েছিল ওরা একদিন এই দেশ চালাবে এবং ভালো চালাবে। আমার কথা কিন্তু ছিল একদিন, অর্থাৎ তাদের প্রস্তুতিটা হোক। কিন্তু তারা সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেলল। সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু এবার নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হয়নি।

প্রশ্ন : তারা তো এককভাবে নির্বাচন করল না।

উত্তর : নির্বাচন করল ভিন্ন মতের দলের সঙ্গে। আমাদের জীবনে বড় স্মৃতি একাত্তর। তাই আমাদের পক্ষে এই নির্বাচনী মৈত্রী মেনে নেওয়া কঠিন। ওদের উচিত ছিল নিজেদের দলকে সংগঠিত করে মানুষকে তাদের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য সময় নেওয়ার। ওরা হয়তো বুঝতে পেরেছিল যে, একা দাঁড়ালে পাস করবে না, তাই চলে গেল নির্বাচনী মৈত্রীতে।

প্রশ্ন : আপনি নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। আপনার প্রস্তাবকে কেন অন্তর্বর্তী সরকার অবজ্ঞা করল?

উত্তর : উপদেষ্টা পরিষদে হেফাজতের একজন সদস্য ছিলেন, যেই হেফাজত নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসভা করে বাতিল ঘোষণা করল। আমাকে বাতিল ঘোষণা করল। সেই সময় উপদেষ্টা পরিষদের যাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছি, রাস্তায় মিছিল করেছি, তারাও নীরব থাকল।

প্রশ্ন : কেন এমন হলো?

উত্তর : ভেতরে কী হয়েছে সেটা আমি জানি না। কোনো দিন জিজ্ঞেসও করিনি। আমরা যেদিন জমা দিলাম সেদিন প্রধান উপদেষ্টা আমাদের প্রতিবেদন হাতে পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। বলছিলেন, তোমরা বড় একটা কাজ করেছ। আমরা কমিশনের ১০ সদস্য আলোচনা করে এটা বানিয়েছি তা না। আমরা ৩৯টি পরামর্শ সভা করেছি। বিভিন্ন পেশার, জাতিসত্তার, শ্রেণির, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেকের সঙ্গে আলাপ করেই সুপারিশ তৈরি করেছি। আমি চেয়েছি মানুষ জানুক, নারীরা কী চায়। অন্তত জনপরিসরে এ বিষয়ে একটা আলোচনার ঝড় উঠুক।

প্রশ্ন : আপনার কথায় মনে হলো, আমরা আগাতে গিয়ে পিছালাম বেশি।

উত্তর : আমরা স্বৈরাচার হটালাম, পাশাপাশি পেছনের দিকেও গেলাম। আমরা চার পা এগিয়েছি পাঁচ পা পিছিয়েছি। এখন অনেক নারীকে রাস্তায় নানা রকমের হেনস্তা করা হয়। নারীরা সবসময়ই হেনস্তার শিকার। কিন্তু এখন সেই ধরনটা পালটেছে। এখন হেনস্তা হলো, আপনার মাথায় কাপড় নেই কেন? আপনার ওড়না কই? এমন আচরণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়।

প্রশ্ন : আপনি কী কিছুটা হতাশ?

উত্তর : আমাদের কমিশনের ওপর যখন আক্রমণ হলো, তখন আমার প্রগতিবাদী বন্ধুরা কিছু বলেনি। কোনো আওয়াজ করেনি। করেছে কারা? একদল তরুণ মেয়ে সংসদ ভবন এলাকায় মৈত্রী যাত্রা করল। মৈত্রী যাত্রা করে ওরা জনপরিসরে জানান দিল যে, আমরা নারী কমিশনের পাশে আছি। সেখানে কিন্তু শুধু নারীরাই ছিল না, পুরুষরাও ছিল। সেটা আমাকে অনেক বেশি আশান্বিত করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত