টাকা ছাপানো সহজ সমাধান?

আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

মধ্যবিত্ত পরিবার কী কষ্টে দিন পার করেন, তা একমাত্র ওই পরিবারের সদস্যরাই ভালোভাবে বোঝেন। যারা বিত্তবান বা সচ্ছল অবস্থায় বসবাস করেন, তারা অনেক সময় বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থা এমন যে, সংসারে টান পড়লে তারা না পারে কারও কাছে সহজে হাত পাততে, না পারে সহজে ধার করতে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের একটি স্থায়ী অসামঞ্জস্য প্রায় সবসময়ই বিদ্যমান। অনেকটা একইভাবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাও এমন এক বেমানান বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার একটি জটিল ও ভারসাম্যহীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে চাইলেই তারা খরচ বাড়াতে পারছে না। গত ৯ মাসে সরকার এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। তবু এই চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে নতুন করে টাকা ছাপানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো টাকা ছাপানোই কি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার একমাত্র উপায়? ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। পরবর্তী বৃহৎ ব্যয় খাত হলো ভর্তুকি ও প্রণোদনা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। এখন এই দুটি প্রধান ব্যয়ের মধ্যে তুলনা করলে রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যক্ষ চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুদ পরিশোধের ব্যয় রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের বাধ্যতামূলক ও ভারী বোঝা। অপরদিকে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতের মধ্যে কিছু ব্যয় জনকল্যাণমূলক হলেও, প্রণোদনার একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে বিত্তশালী গোষ্ঠীর জন্যই বেশি উপকার বয়ে আনে।

বাজেটের আরও বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে মোট প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে অনুদানপ্রাপ্তির পরিমাণ মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকার আরও চাপে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রকাশ্য বা আড়ালে প্রায় সব সরকারই নতুন টাকা ছাপানোর মাধ্যমে এই ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকারও কি সেই একই পথে হাঁটবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। সরকার বাধ্য হয়ে, বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ইআরডি বলছে, বর্তমানে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এমন অবস্থায় নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিদেশি ঋণ চাওয়া হয়েছে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ গত ডিসেম্বরে পাওয়া যায়নি, যা রাষ্ট্রকে নতুন ভাবনায় ফেলেছে। এসব ঋণের উদ্দেশ্য একটাই,  রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ঋণ কিস্তি ও ঋণের সুদ পরিশোধ এবং সরকারের ব্যয় নির্বাহের এমন পরিস্থিতিতে সরকার টাকা ছাপাতে বাধ্য হতে পারে, কিন্তু টাকা ছাপানো কতটা যৌক্তিক? অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, টাকা ছাপিয়ে সরকার তার ব্যয়ভার মেটাতে পারলে এতে দোষের কী। কিন্তু অর্থনীতির ভাষা ভিন্ন।

অর্থনীতি বলছে, টাকা ছাপিয়ে সরকার তার ব্যয়ভার মেটালে তা হয়তো সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে।  কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের জন্য চরম অস্তিত্ব সংকটের প্রশ্ন তুলতে পারে। টাকা ছাপানো অর্থনীতির জন্য ততটুকুই মঙ্গলজনক, যতটুকু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়; অর্থাৎ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী যতটুকু প্রয়োজন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে সামঞ্জস্য, ঠিক ততটুকুই রাষ্ট্রের জন্য ভালো। এর কম বা বেশি হলে তা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই সমীকরণে ভুল করে খেসারত দিয়েছিলেন, জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট জেনারেল মুগাবে। সেখানে বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে গেলে ব্যাগভর্তি বাজার মিলত না। আরও জটিল বিষয় হলো, টাকার অবমূল্যায়ন। টাকার অবমূল্যায়ন হলে, বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কারণ বিদেশিরা এ দেশে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করলেও, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সেই মুনাফা লোকসানে পরিণত হয়। যে কারণে তারা বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হন। অন্যদিকে ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে দেশে বিভিন্ন কারণে ১৮২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ক্রয়াদেশ হ্রাস, কর্মসংস্থান সংকট ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধে জটিলতা দেখা দিয়েছে’ (বণিক বার্তা নভেম্বর ৩, ২০২৫)। যা দেশের অর্থনীতির ওপর অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করেছে। এই অস্থিতিশীলতা কাটাতে দেশের অর্থনীতিকে সাময়িকভাবে গতিশীল করতে সরকার হয়তো ভাবছে, টাকা ছাপানোই সর্বোত্তম পন্থা। কিন্তু অর্থ ছাপিয়ে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত অর্থ নিজেই অর্থহীন হয়ে যাবে।

ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে বলে ইতিমধ্যে অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সরকার নিজের নির্বাচনী ইশতেহার পূরণের জন্য এবং দেশের অর্থনৈতিক ঘাটতি পূরণের জন্য দেশীয় ও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে, বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অনীহা তৈরি হয়। ফলে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের ঘাটতি দেখা যায়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। এ কারণে সরকার হয়তো ভাবতে পারে, অর্থ ছাপিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং ঋণের সুদ পরিশোধে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এর প্রভাব আরও ব্যাপক। এক টাকা ছাপিয়ে বাজারে সরবরাহ করলে এর প্রভাব প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত পড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। সুতরাং সরকারকে দূরদর্শী নীতি প্রণয়ন করে রাষ্ট্রের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করা জরুরি।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত