মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনায় মামলার আবেদনকারী ‘কুকি চিন’ সদস্য

আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা সই উসাইমং মারমা পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্য বলে দাবি করেছে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন। বিমান দুর্ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিমানবাহিনীপ্রধানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন উসাইমং মারমা। এরপর গতকাল বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন করা হয় এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের এ সংগঠনের সভাপতি লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, উসাইমং মারমার সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেন।

সম্প্রতি উসাইমং মারমা ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করেন, মামলার আবেদন করার পর তার রাঙ্গামাটির বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

ওই মামলার আবেদনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও সেই সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, এয়ার ভাইস মার্শাল মোরশেদ মোহাম্মদ খায়ের উল আফসার, গ্রুপ ক্যাপ্টেন রিফাত আক্তার জিকু, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরনবী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, প্রিন্সিপাল (প্রশাসন) মাসুদ আলম, স্কুল শাখার প্রিন্সিপাল রিফাত নবী, রাজউক চেয়ারম্যান, রাজউকের ফিল্ড সুপারভাইজারকে (উত্তরা) আসামি করা হয়।

উসাইমং মারমা ওই অভিযোগ তোলার দুই দিনের মাথায় সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টা অভিযোগ আনল এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, তাদের পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা এবং সদস্যদের মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, যখন বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে আরও সুদৃঢ় করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও সক্ষম বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন কার্যক্রম, ফাইটার প্লেন ক্রয় এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগ সামনে আসার পর থেকেই একটি গোষ্ঠী বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিমানবাহিনীপ্রধানের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন, বিমানবাহিনীর সঙ্গে চরমপন্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে জড়ানোর অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উসাইমং মারমা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তুলে গত ৭ মে মামলার আবেদন করলে তা গ্রহণ করার মতো ‘উপাদান না থাকার’ কারণ দেখিয়ে খারিজ করে দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম।

সেই মামলার আবেদনে বলা হয়, প্রতিদিনের মতো মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা গত বছরের ২১ জুলাই স্কুলে গিয়েছিল। সেদিন দুপুর ১টা ১৮ মিনিটের দিকে ‘আসামিদের সরাসরি দায়িত্বে ও তত্ত্বাবধানে থাকা ত্রুটিযুক্ত’ প্রশিক্ষণ বিমান এফ-৭ বিজিআইকে উড্ডয়নের আদেশ দেওয়া হয়। ‘নবীন’ পাইলট একা ওই যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করলে ‘ত্রুটিজনিত কারণে’ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়। এতে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষিকা, তিনজন অভিভাবক এবং একজন পরিচালকসহ ৩৫ জন মারা যায়। এ ছাড়া ১৭২ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

মামলা খারিজ হওয়ার পর গত ১১ মে ফেসবুক লাইভে এসে উসাইমং মারমা বলেন, গত শুক্রবার গভীর রাতে তিনি যেখানে চাকরি করেন, সেখানে ২০-৩০ জন পুলিশ গিয়ে তার খোঁজ করে। তিনি বলেন, আমার বাড়িতে আশপাশে প্রতিবেশীদের বাসায় পুলিশ তল্লাশি করে খুঁজছিল আমি আছি কি না। কেন? প্রতিবেশীরা জানতে চাইল কেন? সে বলল, ওনার নামে ওয়ারেন্ট আছে, ওই ওয়ারেন্ট যেহেতু আছে ওনাকে ধরতে আসছি আর কি। তো পাশাপাশি গতকাল বাংলাহিলিয়া আর্মি ক্যাম্প থেকে ওয়ারেন্ট অফিসার জিজ্ঞাসা করল আপনি কী করেন? আপনি কোথায় চাকরি করেন? আপনার স্ত্রী কোথায় থাকে? কী চাকরি করে? এই বিষয়গুলো কিন্তু ওনারা জানতে চেয়েছে। আমি কিন্তু ওনাদের বলেছি। তো বলার পর আজকে সকালে নাকি আবার আর্মিরা আমাকে খুঁজছে, খোঁজখবর নিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে উক্য ছাইং মারমার বাবা বলেন, মামলা করাটাই কি অপরাধ ছিল? আমি আমার ছেলের বিচার চেয়েছি। ছেলের বিচারের প্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ চেয়েছি এবং বিগত সরকার কোনো কিছু সুরাহা করেনি। বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেছি, কিন্তু এটার সুরাহা কোনো কিছু পাইনি।

বুধবার এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে উসাইমং মারমার মামলার আবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল্লাহ খান পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, মামলাটা কত মাস পর করতে গেছেন তিনি? ওই মামলাটা কে করেছেন তার নাম আপনারা জানেন? মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি মাইলস্টোন স্কুলে ফাইটার প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত এক শিশু শিক্ষার্থীর বাবা জানানো হলে সাইফুল্লাহ খান বাদী সম্পর্কে সাংবাদিকদের ‘খোঁজখবর’ নিতে পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি (উসাইমং মারমা) কোথায় থাকেন, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী এসব জানার চেষ্টা করেন। কয়েকদিন আগে সন্তু লারমার স্ত্রী কানাডায় একটা প্রোগ্রামে সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে অসংখ্য মিথ্যাচার করেছেন। পাহাড়ে সশস্ত্র বাহিনী এই করে, সেই করে এসব যত ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কথা বলা যায়, তিনি বলেছেন। এরা হলো সব কুকি চিন যারা আছে, এদেরই একটা অংশ... আমি শুধু আপনাদের এতটুকু ক্লু দিলাম। কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।’

বিমানবাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে ‘উগ্রপন্থার’ সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে কিছুদিন আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই সংবাদ প্রতিবেদনগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন জানতে চাইলে সাইফুল্লাহ খান বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে তথ্য ও খবর দিয়ে থাকে আইএসপিআর। যেহেতু এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য আসেনি, তাই বিষয়টাকে গুজব বলে ধরে নেওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত