লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে ইসরায়েল সম্মত হওয়া সত্ত্বেও দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল রবিবার (১৭ মে) চালানো এই ধারাবাহিক হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ডজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি’ (এনএনএ) জানিয়েছে, রবিবার তৈর ফেলসে, তৈর দেব্বা, আজ-জরারিয়াহ এবং জেবচিত পৌর এলাকায় এই হামলাগুলো চালানো হয়। এছাড়া জুয়াইয়া গ্রামে পৃথক আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের সোহমোর, রউমিন, আল-কুসাইবাহ, কফার হুনাহ এবং নাকুরা গ্রামের বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
দক্ষিণাঞ্চলীয় টায়ার শহর থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা ওবাইদা হিত্তো জানান, দক্ষিণ লেবাননে আজ আরও একটি সহিংস দিন পার হলো। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, আমরা ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখছি। ইসরায়েল তাদের হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে গতকাল এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইসরায়েল তার ভূখণ্ড ধরে রাখছে, এলাকা শত্রুমুক্ত করছে এবং নিজেদের সম্প্রদায়কে রক্ষা করছে। একই সঙ্গে আমরা এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছি যারা আমাদের সঙ্গে চাতুরি করার চেষ্টা করছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৯৮৮ জন নিহত এবং ৯ হাজার ২১০ জন আহত হয়েছেন।
গত ১৭ এপ্রিল শুরু হওয়া মূল যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মাঠপর্যায়ে কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে উভয় পক্ষের আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতে সম্মত হয় দুই দেশ। রবিবারের হামলাগুলো মূলত এই সমঝোতার পরপরই চালানো হলো।
কূটনৈতিক সম্পর্কহীন ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে গত মাসে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মার্কিন রাজধানীতে এই তৃতীয় দফার আলোচনা শেষ হলো।
এনএনএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৯ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি নিরাপত্তা প্রক্রিয়া (সিকিউরিটি ট্র্যাক) শুরু করার লক্ষ্যেই এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আগামী ২ ও ৩ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী দফার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে এই সরাসরি আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং কিছু অংশ দখল করে রাখার কারণে তারা ক্ষুব্ধ।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হুসেইন হাজ হাসান বলেন, লেবানন কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলি শত্রুদের সঙ্গে যে সরাসরি আলোচনা করেছে, তা তাদের এমন এক অন্ধগলিতে নিয়ে গেছে যার ফলাফল একের পর এক ছাড় দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ বা অন্য কেউই শত্রুর ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে না, বিশেষ করে যখন বিষয়টি প্রতিরোধের (হিজবুল্লাহর) অস্ত্র সমর্পণের সাথে জড়িত। কর্তৃপক্ষ মূলত দেশের জন্য বিশাল সংকট তৈরি করছে।
এর আগে, গত শনিবার হিজবুল্লাহ জানিয়েছিল, তারা উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান চালানোর কথাও ঘোষণা করেছিল তারা।
চলমান এই যুদ্ধ লেবাননে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্যমতে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসের মধ্যে লড়াইয়ের কারণে ১২ লক্ষাধিক মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে দেশটির অর্থনীতি ধসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। লেবানন বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বাসেম এল-বাওয়াব জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ বিলিয়ন (২,৫০০ কোটি) ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ১২ বিলিয়ন (১,২০০ কোটি) ডলারের প্রয়োজন হবে এবং যুদ্ধ চলতে থাকলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অবকাঠামোর প্রত্যক্ষ ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি লেবানন প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) ডলারের পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আল-জাজিরা
