হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে অ্যাম্বুলেন্সেই দুই দিন

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৮:২৯ এএম

পৃথিবীতে পা ফেলেছে মাত্র ১২ দিন আগে; গত ৮ মে বেলা ১১টায় বাবা আশরাফুল ইসলাম ও মা মাজেদা বেগমের সংসারে ফুটফুটে শিশুটির জন্ম হয়। বাবার নামের সঙ্গে মিল রেখে সন্তানের নাম রাখা হয় আজহারুল ইসলাম। শিশুর আগমনে আনন্দে ভাসছিলেন বাবা-মা। হঠাৎ সে আনন্দে আঘাত হেনেছে হাম-ভাইরাস।

একটি সন্তান একটি পরিবারের হাসি-আনন্দ। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই তাকে ঘিরে বাবা ও মা স্বপ্ন সাজাতে শুরু করেন এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উদ্দিষ্ট পরিবারটির ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো ও অস্বাভাবিক ঘটনা। সন্তানের আগমন যেমন তাদের জন্য খুশির ঘটনা ছিল, এখন ঠিক তেমনি তা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; তাদের দিশেহারা করে তুলেছে।

পৃথিবীর আলো-বাতাসের স্বাদ ভালোভাবে গ্রহণ করার আগেই বাঁচার লড়াই করতে হচ্ছে নবজাতক শিশু আজহারুলকে। গত ১৭ মে চিকিৎসক শিশুটির পরিবারকে জানান, ‘হাম-ভাইরাস বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। শ্বাস-প্রশ্বাস থাকলেও শিশুটি এখন সংকটাপন্ন।’ তার বাবা-মা এখন অসহায় ও দিশেহারা।

আরও দুর্ভাগ্য হলো ঢাকার হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করাতে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে পরিবারটিকে। গত ৪৮ ঘণ্টা হামে আক্রান্ত শিশুটিকে ও তার পরিবারকে থাকতে হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সে। ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়িয়েছেন শিশুটির বাবা ও মা।

এ প্রতিবেদককে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিউশন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালসহ বেসরকারি আরও দুটি হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও ভর্তি করা সম্ভব হয়নি আমার হাম-আক্রান্ত শিশু আজহারুলকে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) সংকটের কথা জানিয়ে এসব হাসপাতালের কোনোটিই আজহারুলকে ভর্তি করায় আগ্রহ দেখায়নি।’ 

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ডিএনসিসি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি করাতে না পেরে ফিরে যাওয়ার সময় শিশুটির মা মাজেদা বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কোনো হাসপাতালই ভর্তি নিচ্ছে না। আইসিইউ নাই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। গত দুদিন অ্যাম্বুলেন্সেই কেটেছে আমাদের। আমার সন্তানের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।’ মাজেদা বলেন, ‘আমার প্রসব যন্ত্রণা এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই ছেলেকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি।’ তিনি অসহ্য যন্ত্রণার অবসান কামনায় আল্লাহর সহযোগিতা কামনা করেন আর্তস্বরে। হাসপাতালের সামনের পরিবেশ বেশ গুমোট হয়ে ওঠে তখন।

দুপুর দেড়টার দিকে ডিএনসিসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, জবাব দিতে আগ্রহ দেখাননি কেউ; বরং জরুরি বিভাগের ডাক্তাররা উচ্চবাচ্য করেন। দায়িত্বরত দুজন নারী চিকিৎসক তাদের নাম পর্যন্ত জানাতে চাননি।

শিশুটির বাবা আশরাফুল ইসলাম বলেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় যে হাসপাতালেই শিশুটিকে নেওয়া হয়েছে, কর্তৃপক্ষ অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ৩টায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে ‘ভর্তি নিলাম কিন্তু আইসিইউ দিতে পারব না; রিস্ক আপনাদের।’ তাতে পরিবারটির দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। তারা নিশ্চিন্ত হতে পারছে না আমাদের সন্তানের জীবন নিয়ে। 

একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ছোট চাকরি করেন শিশুটির বাবা। মাজহারুল ইসলাম নামে ৫ বছর বয়সী তার আরেকটি সন্তান আছে। এত বড় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। তবু আশায় বুক বেঁধে আছেন, তার ছোট্ট শিশু সুস্থ হবে; বাসায় ফিরবে, পরিবার নিয়ে হাসি-আনন্দে থাকবে।

ঢাকার আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা থানার কাছে ভাড়া বাসায় থাকেন জানিয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘হাম মহামারী আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসাসেবা সেভাবে পাচ্ছে না আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো। হামে আক্রান্ত শিশু আজহারুল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু ব্লক-৪২২ নম্বরের ২৪ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন। আইসিইউ জরুরি। খালি হলেই আইসিইউ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে শিশুটিকে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত