পাখিটি তির তির করে উড়ছে

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ এএম

ফাতিমা আমাকে রোজ একটি করে গল্প শোনায়।

এ রকম অনেক গল্প থেকে একদিন শুনেছিলাম পাখির গল্প। ফাতিমা নিজে দেখেছে ওই পাখিটাকে। ছোট্ট সেই পাখিটা ফুটপাতের ওপর পড়েছিল। প্রাণহীন। নিঃসাড়। ডানা দুটো শীতের কুয়াশায় ভিজে চুপসে ছিল। ঠোঁটের ডগায় জমে ছিল শিশির বিন্দু।

বললাম ‘কোথায় দেখেছ?’

ফাতিমা জানাল, ‘স্কুল থেকে ফেরার পথে। রিকশা করে বাসায় যাওয়ার সময় স্কুলের দেয়ালের পাশের ফুটপাতে পাখিটাকে পড়ে থাকতে দেখেছি। মাকে বললাম, দেখ দেখ। মা-ও তাকাল।’

রিকশাচালক বলল, ‘মইরা গেছে। উড়তে ছিল, মনে হয় ইলেকট্রিকের শক খাইছে।’

‘হতে পারে।’ মা মৃদু কণ্ঠে নরম স্বরে বলল।

গল্পটা এখানে শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু না, শেষ হয়নি। আমাদের গল্পে আরও নতুন ঘটনা যুক্ত হয়েছে। নতুন দৃশ্য তৈরি হয়েছে।

মায়ের মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে রিকশায় বসে ফাতিমা ওই মৃত পাখিটার ছবি তুলেছিল। রাতে মায়ের পাশে শুয়ে শুয়ে পাখিটাকে দেখতে থাকে। জুম করে পাখিটার রঙিন পালক দেখে। চোখ দেখে। ঠোঁট দেখে। পা দেখে। কিন্তু পাখিটার কি নাম? ফাতিমার জানা নেই।

আমাদের চোখের সামনে দিয়ে কত পাখি উড়ে যায়। গাছে গাছে কত পাখি কিচির মিচির করছে। খালে-বিলে মাঠে-ঘাটে কত রকম পাখি টুকুর টুকুর করে কত কী খাচ্ছে। আবার ফুরুৎ করে উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এসব পাখির নাম জানি না। ওরা কী খায়? কোথায় থাকে তারও খোঁজ রাখি না। অথচ পাখিরাও আমাদের প্রতিবেশী। আমাদের বন্ধু। খাঁচায় পোষ মানানো কোনো কোনো পাখি মানুষের নাম ধরে ডাকতেও জানে। পাখিদের জন্য অদ্ভুত ভালোবাসা জেগে ওঠে ফাতিমার হৃদয়ে। মোবাইল ফোনে তুলে রাখা মৃতপাখিটার ছবি দেখতে দেখতে ফাতিমার চোখ ভিজে যায়। কষ্টে ভীষণ কান্না পায়।

হঠাৎ পাখিটা বলে উঠল, ‘তুমি কাঁদছ কেন? এই যে দেখ আমি উড়ছি। তুমিও ওড়ো।’

‘আমার তো তোমার মতো ডানা নেই। উড়ব কীভাবে?’

‘দুই হাত দুই দিকে মেলে ধর। এই হাত দুটো হয়ে উঠবে তোমার ডানা। এবার ওড়ো। কল্পনায় ওড়ো। স্বপ্নে-স্বপ্নে ওড়ো। আমার মত ওড়ো।’

ফাতিমা দেখতে পেল ফুটপাতে পড়ে থাকা সেই মৃত পাখিটি তির তির করে উড়ে যাচ্ছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে পুকুরের পানি যেমন তির তির করে ঢেউ তুলে ঠিক তেমনই মুক্ত আকাশের বুকে বাতাসে ভর করে তির তির করে পাখিটি উড়ছে। ডানা ঝাপটাচ্ছে। পিট পিট করছে ওর চোখ দুটো।

মোবাইল ফোনের নিষ্প্রাণ ছবি থেকে যেন প্রাণ ফিরে পেয়ে পাখিটি উড়ছে আর ফাতিমাকে ডাকছে।

ফাতিমা নিজেকে এখন পাখির মতো ভাবছে। অসীম আকাশের বুকে পাখির মতো যেন উড়ে যাচ্ছে সে-ও। ওর স্বপ্নগুলো উড়ছে। ইচ্ছেগুলো উড়ছে। এতদিন শুধু পাখি, ঘুড্ডি, আর এরোপ্লেনকে উড়ে যেতে দেখেছে। আজ নিজেই উড়ে যাচ্ছে। শহরের কোলাহল ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে। শব্দ দূষণ, বায়ুদূষণ, পরিবেশ দূষণ এ রকম নানান দূষণ এড়িয়ে ফাতিমা উড়ছে পাখির মতো।

গায়ের রঙ, ভাষা, আচরণ, গড়ন দেখে যেমন মানুষদের নানা জাতিতে ভাগ করা হয় তেমনি আকৃতি ও চালচলন দেখেও পাখিদের ভাগ করা যায়। আকাশের সীমানা জুড়ে কিংবা বনবনানির ডালে ডালে, শাখায় শাখায় কত-কত প্রজাতির পাখি আছে। ওরা উড়ছে। ওরা ঘুরছে। কোনোটা আবার নিজেদের জন্যে খড়কুটো দিয়ে বাসা বুনছে। পাখিরা চঞ্চল। পাখিরা মুক্ত।

ফাতিমা নিজেকে আজ মুক্ত পাখির মতোই ভাবছে। কিন্তু সে মানুষ। মানুষেরই তো বুদ্ধি থাকে। কিন্তু পাখিদের কি বুদ্ধি নেই? বুদ্ধি না থাকলে উড়ছে কীভাবে? কখনো ডান দিকে। কখনো বাম দিকে। কখনো সোজাসুজি। বুদ্ধি না থাকলে পাখিরা কেমন করে উড়ে উড়ে নিজেদের পথ চিনে নেয়!

ফাতিমা ভাবছে মৃত পাখি জীবন্ত হয়ে উঠেছে, এ তো আমার কল্পনা। আমি পাখিটার সঙ্গে উড়ে যাচ্ছি এ তো আমার স্বপ্ন। আমি তো উড়তে চাই। পাখির মতো উড়তে চাই। তৎক্ষণাৎ অনুভব করল সেও উড়ছে।

ফাতিমা উড়ছে। উড়ছে।

উড়তে উড়তে হঠাৎ অনুভব করল একটা কিছু ওর কপাল ছুঁয়ে দিয়েছে। সেটা কি ফাতিমার মায়ের হাত নাকি পাখিটার ডানার স্পর্শ? নাকি ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্ন?

আমি নিজেও জানি না। কারণ ফাতিমা আমাকে জানায়নি। তবে ফাতিমার কাছ থেকে শোনা অন্য এক গল্পে একটা চড়ুই এসেছিল কোনো একদিন।

ফাতিমা বলল, খুব কান্না পেয়েছিল সেই চড়ুইপাখির জন্য।

বারান্দার গ্রিল ছুঁয়ে বাহারি লতাপাতায় যখন রোদ এসে আলো মেখে দেয় ঠিক সে সময় একটা চড়ুই এসেছিল চুইচুই করে। চড়ুইটা ডাকতো আর ছটফটাতো। ফাতিমা নিজে নিজেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করত।

যেমন ফাতিমা বলল, ‘তুমি কী এখন ক্লান্ত?’

চড়ুইপাখিটা চুইচুই করে লেজ দোলালো। তার মানে, হ্যাঁ, আমি ক্লান্ত।

ফাতিমার মন বলছে চড়ুইটা যেন এ কথাই বলতে চাইছে।

ফাতিমা আবার প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি বারান্দায় তোমার ঘর বানাবে?’

চুইচুই করে লেজ দোলাতে দোলাতে চড়ুইটা ডানদিকের গ্রিল ছেড়ে বাম দিকের গ্রিলে গিয়ে বসে। তার মানে হ্যাঁ বানাতে চাই।

ফাতিমার মন বলছে চড়ুইটা যেন এ কথাই বলতে চাইছে।

ফাতিমা বলল, ‘ঘর বানানোর জিনিসপাতি নিয়ে আসো।’

সঙ্গে সঙ্গে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিল চড়ুই পাখিটা। আর ফিরে এলো না কোনো দিন। সেই চড়ুইটাকে আর দেখতে না পেয়ে ফাতিমার মনটা এখনও কাঁদে।

স্কুল থেকে বাসায় আসার পথে দেখা মৃত পাখি আর হারিয়ে যাওয়া সেই চড়ুই পাখির কথা ভেবে একদিন ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ফাতিমা প্রথমবার বুঝল, অনেক অনেক পাখি আছে যারা কখনই ফিরে আসে না। শুধু স্মৃতির আকাশে উড়ে বেড়ায়।

সেই থেকে যখনই কোন পাখি আকাশে উড়ে যেতে দেখে তখনই ফাতিমা হাত নাড়িয়ে বলতে থাকে, ভালো থেকো পাখিরা, ভালো থেকো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত