বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ

১৬৪ ধারায় আসামির জবানবন্দী, সাত কার্যদিবসে চার্জশিটের আশ্বাস পুলিশের

আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

‘মাদকে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তরুণ-যুবকেরা মাদক বিক্রি করে। চারিদিকে মাদকাসক্তের ছড়াছড়ি। সমাজটা যদি এমন না হতো আমার নাতনি ধর্ষণের শিকার হতো না।’ ক্ষোভের সুরে দেশ রূপান্তরকে কথাগুলো বলেছেন চট্টগ্রামের নগরের দক্ষিণ বাকলিয়া নুর হোসেন চেয়ারম্যান ঘাটায় গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) যৌন নিপীড়নের শিকার চার বছর বয়সী এক কন্যা শিশুর নানী কোহিনুর বেগম।

শুক্রবার (২২ মে) বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ঘটনাস্থল দক্ষিণ বাকলিয়ার বাসায় গেলে তিনি এসব কথা বলেন।

নাতনিকে ধর্ষণের জন্য মাদকাসক্ত যুবসমাজকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ এখানকার মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে। মাদকাসক্তিরা দিনভর রাস্তায় ঘুরোফেরা করে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকলে আমার নাতনির আজ এই পরিণতি হতো না।’

জানা গেছে, দক্ষিণ বাকলিয়া আবু জাফর রোডের নুর হোসেন চেয়ারম্যান ঘাটার ‘বিছমিল্লাহ ম্যানশনের’ নিচতলায় নানা-নানীর সঙ্গেই থাকেন শিশুটি। শিশুটি তার মেয়ের ঘরের নাতনি। শিশুটির মা নানীর কাছে তিন সন্তানকে রেখে বৃহস্পতিবার সকালে চলে যান কর্মস্থল কর্ণফুলী নদীর ওপারে একটি পোশাক কারখানায়। ঘটনার দিন বেলা দুইটার দিকে টিসিবির পণ্য আনতে বাসা বের হন কোহিনুর বেগম। এসময় বাসায় ছিলেন শিশুটির নানা মো. সিরাজুল ইসলাম। বেলা সোয়া তিনটার দিকে বাসার সামনে খেলাধুলা করার সময় ওই শিশুকে কৌশলে ডেকে বালুমাঠের মুখে ভাই ভাই ডেকোরেশনের গুদামে নিয়ে যান মনির। সেখানে শিশুটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

এদিকে বেলা সোয়া তিনটার দিকে বাসায় এসে শিশুটির নানী কোহিনুর দেখতে পান, তার নাতনি বাসার সামনে যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। কাঁদছে আর ছটফট করছে। নানী জানতে চাইলে বলে, ‘আমার গলা ও মুখ চেপে ধরে এক লোক ব্যথা দিয়েছে।’ এ সময় শিশুটির প্রচুর রক্ষক্ষরণ হচ্ছিল। লোকটি সে চিনে কিনা জানতে চাইলে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে নানীকে সঙ্গে নিয়ে অদূরে বালুরমাঠের মুখে ভাই ভাই ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনিরকে শনাক্ত করে শিশুটি।

বিষয়টি জানাজানি হলে মুহুর্তের মধ্যে পুরো এলাকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করে পুলিশ। ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মনিরকে থানায় নিতে গিয়ে দীর্ঘ সাত ঘণ্টা যাবত অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় পুলিশকে। কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পুলিশ।

এসময় দুজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়। আহত হন অনেকে। পরে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কৌশলে মনিরকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে নগরের বাকলিয়া থানায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেই মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মেহেদী হাসান (২৬)। মামলায় অভিযুক্ত মনির হোসেনকে (৩০) একমাত্র আসামি করা হয়েছে। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন ঘারঘাটা বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড এলাকায়। 

নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভুঁইয়া দেশ রূপান্তরকে শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘শিশুটি ধর্ষণের ঘটনায় থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত মনিরকে আজ শুক্রবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়েছে। তিনি দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।’

মামলার তদন্ত কার্যক্রম আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে সমাপ্ত করা হবে বলে জানিয়ে পুলিশের অন্যতম এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা চলছে। সে এখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন। ডিএনএ টেস্ট করা হবে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে। এছাড়া ঘটনার দিন পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং স্থানীয় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাঙচুরের অভিযোগে আরও দুটি মামলা করা হবে।’

দক্ষিণ বাকলিয়ায় মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে পুলিশ নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হোসাইন কবীর ভুঁইয়া বলেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকাটিতে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কম। পুলিশ মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে শুক্রবার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে সরেজমিন ঘটনাস্থলে গেলে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি দেখা যায়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের আনাগোনা দেখা গেছে। মাত্র চার বছরের শিশুর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন মেনে নিতে পারছেন না এলাকার কেউ।

আবদুর রহিম নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বলে সমাজে অপরাধ দিন দিন বেড়ে চলেছে। ধর্ষক মনিরকে জনতার হাতে পুলিশ ছেড়ে দিলে ঘটনা এতদূর যেতো না।

স্থানীয় দোকানদার ফারহান হোসেন বলেন, দক্ষিণ বাকলিয়ায় অপরাধ নির্মূল করতে হলে আগে মাদক নির্মূল করতে হবে। এখানে দিনের বেলায়ও মাদকের রমরমা হাট বসে। পুলিশ এসব জেনেও তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির মুখোমুখি করছে না। অথচ এলাকায় মাদকসেবীরা ঘুরে বেড়ায়। মাদকমুক্ত হলে জঘন্য এসব অপরাধে জড়াবে না যুব সমাজ। আমি ধর্ষক মনিরের ফাঁসি চাই।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মনিরকে বিকেল চারটার দিকে আটক করে পুলিশ। তাকে থানায় নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্তকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে শত শত মানুষ পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে অবস্থান নেন। এসময় বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে রাত ৮টার পর অতিরিক্ত পুলিশ-র‍্যাব গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সরানোর চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বেশ কিছু সংবাদকর্মীকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় ভাঙচুর করা হয় একটি কমিউনিটি সেন্টারসহ বেশ কিছু স্থাপনা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হন স্থানীয় লোকজন। রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ কৌশলে অভিযুক্তকে একটি ভবন থেকে বের করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে চলে যায়।

এরপরও উত্তেজিত লোকজন সড়কে অবস্থান নেন এবং আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। রাত ১১টার দিকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হলে আটক মনিরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত