রেটিং অবনমন ঝুঁকির বাস্তবতা

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ঋরঃপয, বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিংয়ের পূর্বাভাসকে গত ১২ মে ‘নেগেটিভ আউটলুক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যদিও দেশের বর্তমান ঋণমান বি প্লাসে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠে, বাংলাদেশ কি সত্যিই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে, নাকি এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষিতে একটি সাময়িক সতর্কবার্তা মাত্র? যেখানে রয়েছে আস্থার সংকট, নীতিগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়। ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন সব সময়ই কোনো দেশের অর্থনীতির তাৎক্ষণিক অবস্থা নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রবণতার একটি পূর্বাভাস। ফলে নেগেটিভ আউটলুক মানেই অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, এমন সরল ব্যাখ্যা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি ইঙ্গিত দেয় বিদ্যমান নীতি, বৈশ্বিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা দ্বিমুখী। একদিকে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, স্থিতিশীল কৃষি উৎপাদন, তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। অন্যদিকে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, উচ্চ আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশি^ক বাজারে অনিশ্চয়তা। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার সংমিশ্রণ আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে ‘সতর্ক অবস্থান’ তৈরি করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।

উচ্চ সুদের হার, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সংকোচন নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণগ্রহণ কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক চাপের বাইরে নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হওয়ায় রেটিং সংস্থাগুলো ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। রেটিং এজেন্সিগুলো সাধারণত কয়েকটি মৌলিক সূচকের ওপর গুরুত্ব দেয়। তা হলো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের স্থিতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের উদ্বেগের জায়গাগুলো প্রায় একই। প্রশ্ন হলো, এই সতর্কতা কি কেবলই বাহ্যিক চাপের ফল নাকি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত? বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শিল্প খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেও, এটি বৈশ্বিক চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধের ভবিষ্যৎ চাপও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবুও এটিকে সরাসরি সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা একপাক্ষিক ব্যাখ্যা হবে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো, এর স্থিতিস্থাপকতা বা জবংরষরবহপব।

অতীতেও বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট যেমন ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা ও কোভিড-১৯ মহামারী বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত কাটিয়ে উঠেছে। রপ্তানি পুনরুদ্ধার, রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ঋরঃপয জধঃরহমং বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ দেশের প্রায় অর্ধেক রেমিট্যান্স আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশও এ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। তবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ সংকটের লক্ষণগুলো আরও আগে থেকে দৃশ্যমান। গত কয়েক বছরে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, ডলারের একাধিক বিনিময় হার চালু করা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এসেছে। আবার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়লেও, বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা আছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এমন দাবি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। তবে ঝুঁকির কিছু ইঙ্গিতও উপেক্ষা করা যায় না। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে চাপ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এসব উপাদান অর্থনীতির ওপর স্বল্পমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কার ধীর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও গভীর হতে পারে। আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। তবে ঝুঁকি আছে কিনা তা বড় কথা নয় বরং আমরা সেই ঝুঁকিকে কীভাবে মোকাবিলা করছি সেটিই আসল বিষয়।

অর্থনীতি কোনো স্থির অবস্থা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সঠিক নীতি, সময়োপযোগী সংস্কার এবং বৈশি^ক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সত্যিই ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক সতর্ক সংকেত। প্রয়োজন বাস্তববাদী নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সে জন্য প্রথমত, দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হবে, খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। এ ছাড়াও প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণনীতি, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণের স্বচ্ছ হিসাব। দ্বিতীয়ত, বিনিময় হারকে বাস্তবতার কাছাকাছি আনতে হবে। কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে সংকট বাড়ায়। বাজারকে সম্পূর্ণ মুক্ত না করলেও নীতির স্বচ্ছতা জরুরি। তৃতীয়ত, কর ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বড় অংশ কার্যত করের বাইরে থেকে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যদি রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হয়, তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। চতুর্থত, অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। প্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ শিল্প, ডিজিটাল সেবা এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নকে আরও উৎপাদনমুখী করতে হবে।

আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে বৈশ্বিক আস্থা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং আর্থিক বয়ানের ওপরও। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বড়। একদিকে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বয়ানের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে। বিশে^র অনেক দেশ যেমন : ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এমন পরিস্থিতি থেকে নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার ইতিবাচক অবস্থানে ফিরে গেছে। তারা পেরেছে, কারণ সংকটকে স্বীকার করেছে এবং কঠিন সংস্কার করেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষা। রেটিং আউটলুক অবনমন কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। তাই এটিকে জবভড়ৎস ংরমহধষ হিসেবে দেখলে, সংকটই পরিবর্তনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত