বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন অধ্যায়ে বড় স্বপ্ন নিয়েই এসেছেন জার্মান বংশোদ্ভূত কোচ টমাস ওলডে ক্রিশ্চিয়ানসেন ডুলি। মঙ্গলবার বাংলাদেশে এসে প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, শুধু ফল নয়, দলের খেলার ধরন, মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়েও তার পরিষ্কার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুক্রবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসপিএ) ক্রীড়া পুরস্কার অনুষ্ঠানে হঠাৎই হাজির হন তিনি। এরপর এশিয়ার ফুটবলের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে ডুলি বলেন, খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই তিনি এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ফুটবল আবেগের সঙ্গে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে জাপান সফরের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে ফিলিপাইন জাতীয় দলে কাজ করার সময় পুরো এশিয়া ঘুরে দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে আবারও এশিয়ায় ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছে।
বাংলাদেশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি খোলামেলা কথা বলেন। তার কথায়, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে মানুষ ফুটবলকে ভীষণ ভালোবাসে। মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে কাজ করার সময় বাংলাদেশের অনেক ফুটবলপ্রেমীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বাংলাদেশের কোচের পদে আবেদন করার বিষয়ে ডুলির বক্তব্য, ‘এখানে (বাংলাদেশে) প্রচুর আবেগ রয়েছে এবং আমি বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুটা জানতামও। তাই যখন প্রধান কোচের এই পদটি খালি হলো, আমি আবেদন করলাম। আমি ভাবলাম এখানে কাজ করতে পারলে দারুণ হবে, কারণ এটি ফিলিপাইনেরও কাছাকাছি যেখানে আমি খেলেছি, আবার আমার বাবা-মায়ের দেশ জার্মানির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা সহজ।’ বাংলাদেশের সমর্থকদের চাপ নেওয়ার বিষয়ে ডুলি বলেন, ‘না, এটা কোনো ব্যাপার না, আমি এর জন্য প্রস্তুত। আমি জার্মানি থেকে এসেছি এবং জার্মানিও ঠিক একই রকম।’
বাংলাদেশের সমর্থকদের আবেগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই হাস্যরসের সুরে ডুলি বলেন, ‘এখানে হয়তো এক মিলিয়ন (দশ লাখ) কোচ ঘরের বাইরেই ঘোরাঘুরি করছে! তারা সবাই ফুটবলটা বোঝে এবং সেটা ভালো কথা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ!’
‘আমি এটার জন্য প্রস্তুত। জার্মানিতেও একই অবস্থা। বাংলাদেশে আমাদের হয়তো ১০ লাখ কোচ আছেন। তারা সবাই ফুটবল বোঝেন এবং এটি ভালো। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। আমি সবসময় আমার খেলোয়াড়দের এবং ফেডারেশনকেও বলি যে, লক্ষ্য যদি বাস্তবসম্মত হয় তবে আমরা যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারি। আমরা গত ২৩ বছরে কিছু জিতিনি; এখন সময় এসেছে তা করার।’
তবে এটিকে নেতিবাচকভাবে নয়, বরং ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন তিনি। জার্মানির ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনা করে তিনি জানান, এমন আবেগই ফুটবলকে জীবন্ত রাখে। দলের খেলার ধরন নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন এই কোচ। তার দর্শন হলো আক্রমণাত্মক ও বল দখলে রেখে ফুটবল খেলা। তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবল খেলতে পছন্দ করি, ফুটবলের পেছনে দৌড়াতে না।’ অর্থাৎ শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলাতে চান তিনি।
তবে ডুলি বাস্তববাদীও। রাতারাতি সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং ধীরে ধীরে উন্নতির কথা বলেছেন, ‘আমার লক্ষ্য হলো র্যাংকিং ১৬০ বা ১৫০-এর মধ্যে নিয়ে আসা। এটি রাতারাতি ঘটবে না। এটি একটি প্রক্রিয়া। আমি এই বিষয়ে একটি বইও লিখেছি ‘দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট সাকসেস ইন সকার দ্যাট নো ওয়ান টিচেস’। সেখানে চারটি স্তম্ভ রয়েছে এবং যার একটি হলো মানসিকতা। মানসিকতা পরিবর্তন করা যাবে না, এটি আপনার চিন্তাভাবনার ধরন। আমাদের ফুটবল নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং আমাদের কী করা দরকার তা বুঝতে হবে, তাহলেই আমরা যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারব। লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে হবে। আগামীকালের মধ্যে না হলেও, হয়তো এক বছরের মধ্যে ১৬০-এর নিচে আসা বাস্তবসম্মত।’
ডুলির মতে, সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো মানসিকতা। কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সঠিক চিন্তাভাবনা ছাড়া কোনো দল বড় হতে পারে না। আর সেই মানসিক পরিবর্তন দিয়েই বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন যুগ শুরু করতে চান তিনি।
