একজন মানুষ পৃথিবীতে আসার আগেই যার সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তিনি মা। সন্তানের অস্তিত্বের শুরু থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপে মায়ের অবদান এত গভীর, এত বিস্তৃত যে তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুই বছরে তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা লুকমান ১৪)
এই আয়াতে মায়ের ত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য যে কষ্ট, যন্ত্রণা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একজন মা অতিক্রম করেন, তার তুলনা নেই। গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, লালন-পালন, নির্ঘুম রাত আর সীমাহীন দুশ্চিন্তার ভেতর দিয়ে মা সন্তানের জীবনকে গড়ে তোলেন। অথচ অধিকাংশ সময় তিনি এর বিনিময়ে কিছুই চান না। সন্তানের হাসিই তার আনন্দ, সন্তানের সফলতাই তার গর্ব।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসে তিনবার মায়ের কথা উল্লেখ করে ইসলাম মায়ের অধিকারের গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাত মায়ের পদতলে।’ (সুনানে নাসাঈ)
আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ফেলছেন। কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন কিংবা পারিবারিক টানাপড়েনের কারণে অনেক মা-বাবা একাকিত্বে দিন কাটান। কেউ কেউ সন্তানের মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকেন, কেউ একটি ফোনকলের আশায় থাকেন। তা থেকে তারা বঞ্চিত হোন। অথচ ইসলাম শুধু ভরণ-পোষণের দায়িত্বই দেয়নি, বরং দিয়েছে ভালোবাসা, সম্মান, সঙ্গ এবং হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ।
মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল সামাজিক কর্তব্য নয়, এটি ইবাদতও বটে। একজন মানুষ যত বড় পদে অধিষ্ঠিত হোক, যত ধন-সম্পদের মালিক হোক, মায়ের একটি নিঃস্বার্থ দোয়ার সমতুল্য কিছুই নয়। পৃথিবীর সব সম্পর্ক কোনো না কোনো স্বার্থের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা স্বার্থহীন, নির্মল ও অকৃত্রিম।
তাই জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে মায়ের খোঁজ নেওয়া, তার সঙ্গে সময় কাটানো, তার মুখে হাসি ফোটানো এবং তার দোয়া অর্জনের চেষ্টা করা প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য। কারণ সত্যিই মায়ের তুলনা হয় না। পৃথিবীর কোনো সম্পদ, কোনো অর্জন, কোনো সম্পর্ক মায়ের বিকল্প হতে পারে না।
মায়ের সম্মান ও মর্যাদা সবসময়ের