দেশের লিচুর রাজধানী খ্যাত দিনাজপুরে এখন চলছে মধুমাসের উৎসব। বাগান থেকে বাজার সবখানেই জমে উঠেছে রসালো বেদানা, মাদ্রাজি ও চায়না-৩ জাতের লিচুর বেচাকেনা। উন্নতমানের এই লিচুর চাহিদায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পাইকাররা। জমে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় লিচুর মার্কেট। ভালো ফলন ও সন্তোষজনক দামে খুশি চাষিরা।
চাষিরা জানান, দাম ভালো পাচ্ছেন।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক কম।
ক্রেতারা জানান, গতবারের চেয়ে এখন পর্যন্ত দাম অনেক কম।
দিনাজপুরের কালিতলা, পুলহাট, সিকদারহাট, মহব্বতপুর, উলিপুর, মাসিমপুর ও আউলিয়াপুর এলাকায় এখন জমে উঠেছে লিচুর পাইকারি ও খুচরা বাজার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা বাগান ও আড়ত থেকে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে জেলার বাজারগুলো দেশের অন্যতম বড় ফল বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন লিচুবাগানে এখন নারী-পুরুষ শ্রমিকরা গাছ থেকে লিচু পেড়ে আঁটি তৈরি করছেন। কেউ আঁটি গুছিয়ে ঝুড়িতে রাখছেন, কেউ আবার দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর জন্য প্যাকেটজাত করছেন। প্রতিটি বাগান যেন মৌসুমি কর্মসংস্থানের এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র।
দেশের সবচেয়ে বড় লিচুর মার্কেট হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর শহরের কালিতলা নিউ মার্কেট।
এই মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে বেচাকেনা। একদিকে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক। অপরদিকে চলছে দর-কষাকষি। বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু বেশি দেখা গেলেও খুচরা বাজারে অল্প পরিমাণ দেখা মিলেছে বেদানা ও চায়না-থ্রি লিচু। বাজারের দুই পাশে রাস্তার উপর সারি সারি ভাবে দাড়িয়ে আছে লিচু নিয়ে আসা ভ্যান ও ইজিবাইক।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারিতে মাদ্রাজি লিচুর হাজার বিক্রি হচ্ছে ১৮০০-২০০০ টাকা। বেদানার হাজার ৩৫০০ টাকা থেকে ৬০০০ হাজার, চায়না থ্রি সাত-আট হাজার এবং বোম্বাই ২২০০-২৫০০ টাকা।
সদর উপজেলার সিকদার গ্রামের বাগান মালিক আকরাম আলী বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজার দরও সন্তোষজনক। অনেক লিচু বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আশা করছি মৌসুম শেষে ভালো লাভ হবে।
মহব্বতপুর এলাকার লিচু চাষি আব্দুল হান্নান বলেন, দিনাজপুরের লিচুর সুনাম দেশজুড়ে। প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনছেন। যত্নসহকারে সংগ্রহ করে আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছি।
লিচু ক্রেতা মুশফিকুর রহমান বলেন, বেদানা লিচু ৫০০ টাকা এবং চায়না থ্রি ৮০০টাকা শ হিসেবে লিচু কিনলেন। দাম কম পেয়ে তিনি খুশি। গত বছর বেদেনা লিচু ৮০০ টাকা ও চায়না থ্রি ১২০০ টাকা প্রতি শ হিসেবে কিনেছি। এবছর একটু দাম কম রয়েছে।
অপর ক্রেতা সাজেদুর রহমান বলেন, এই বাজার থেকে আমি প্রতি বছর ঢাকায় লিচু পাঠাই। ঢাকায় আমার আত্মীয়-স্বজনরা দিনাজপুরের লিচু খুব পছন্দ করে। গত বছর একটু দাম বেশি ছিল। কিন্তু এবছর দাম কম রয়েছে।
লিচুর আড়তদার ও ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ বলেন, দিনাজপুরে উৎপাদিত প্রায় ৮০ শতাংশ লিচু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। মাত্র ২০ শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। ফলে মৌসুমজুড়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফলের বাজারে পরিণত হয় এই জেলা।
ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, আজকে বাজারে দেখছি লিচুর আমদানি ব্যাপক। অনেক লিচু এসেছে বাজারে। আমি বাগান থেকে মোম্বাই লিচু নিয়ে এসেছি ২৪০০ করে প্রতি হাজার। এখানে দিলাম ২০০ টাকা লসে ২২০০ করে। গতকাল দাম ভালোই ছিল। কিন্তু আজ ব্যাপক লিচু আমদানি হওয়ায় দাম কম।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান আছে পাঁচ হাজার ৪১৮টি। এর মধ্যে বোম্বাই লিচু তিন হাজার ১৭০ হেক্টর, মাদ্রাজি ১ হাজার ১৬৬ হেক্টর, চায়না-থ্রি ৮০২ হেক্টর, বেদানা ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টর, কাঁঠালি ৫৬ হেক্টর ও মোজাফফরপুরী ১ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ির উঠান, বাগানসহ লিচুগাছ আছে প্রায় সাত লাখ। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন।
গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩০ মেট্রিক টন। বাজার মুল্য ছিল প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবে এবার লিচুর ফলন কিছুটা কম।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসার অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, এবার প্রাকৃতিক কারণে লিচুর ফলন কিছুটা কম হলেন, ফলন মান সম্মত হয়েছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবাল লিচুর আকার, সাইজ ও রং ভাল। কেবল বাজার শুরু হয়েছে। প্রথমের দিকে একটু দাম কম থাকলেও বাজার বাড়তে শুরু করেছে। চাষিরা দাম ভাল পাবেন আশা করছি।
