সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে পারিবারিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানম-িতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অন্য অতিথিরা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিপিডি।
সংবাদ সম্মেলনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক নানা ধাক্কার কারণে অর্থনীতি এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে জানিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূলত জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতের খরচ বৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম। ফলে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ; পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতেও পড়ে। ফলে বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশজুড়ে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও একলাফে অনেক বেড়েছে বলে জানায় সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, গত মার্চ মাসে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এই দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে জুনে এসে হয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা।
জ্বালানি খরচের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতাকেও মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর থাকার কারণে প্রায়ই খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সাধারণ ভোক্তারা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা পরে যে বাজেটগুলো দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে সবসময় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা-পেনশন এটা ছিল নম্বর ওয়ান ও শিক্ষা ছিল দ্বিতীয় নম্বরে। এখন শিক্ষা চলে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের পরিসেবার খরচ দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। এটা থেকে বোঝা যায় যে আমরা একটা ঋণ ফাঁদে পড়তে পারি।’
বাজারে আসতে কাঁচা মরিচের দাম বাড়ে ১১৬%, পেঁয়াজ ৮৭% : দেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, খামার বা উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ। একই সময়ে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ডালের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনে ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানম-িতে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশ অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা যত বেশি, ভোক্তাকে তত বেশি দাম দিতে হয়। বর্তমান বাজার কাঠামোয় কিছু অংশীজন সংগ্রহ ও খুচরা দামের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন।’
সিপিডি জানায়, পেঁয়াজ, আলু, শাকসবজি, ডিম ও মাছ বিপণনের ক্ষেত্রে শহরভিত্তিক আড়তদারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খুচরা বিক্রেতারা পণ্য সংগ্রহে তাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে এবং আড়তদারদের প্রভাব আরও বাড়ছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই নির্ভরশীলতা বাজারে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। সীমিত সংখ্যক মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে বাজারক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে, ফলে অপ্রতিযোগিতামূলক আচরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে লাভের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস ও মাছের মতো তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত সরবরাহ শৃঙ্খল থাকা পণ্যে উৎপাদক ও খুচরা পর্যায়ের দামের ব্যবধান অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে পর্যন্ত গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৯০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে রুই মাছ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৩৬৫ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৯০ টাকা।
