দুর্লভ নীল-ডানা হরবোলা, বিরল চাঁদিয়াল আর নীল-ঘাড় সুমচা পাখি দেখে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বিট থেকে ফিরছি। অর্ধেক পথ পাড়ি দেয়ার পর সবুজ মাথা, বেগুনি গলা ও কালো দেহের বর্ণিল এক পাখিকে তার লম্বা বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে টকটকে লাল রঙের ফায়ারস্পাইক বা এ জাতীয় কোন ফুলের নির্যাস নিতে দেখলাম। চারজনের দলের সবচেয়ে পেছনে ছিলাম আমি। আমার গলায় ক্যামেরা ও ডান হাতে একটি লাঠি। লাঠি ফেলে ক্যামেরা অন করতে করতেই পাখিটি বনের ভেতর হারিয়ে গেল। সঙ্গীরা ছবি তুলতে পারলেও আমার পক্ষে তা সম্ভব হলো না। এটি ছিল একটি পুরুষ পাখি। তবে জলপাই রঙের স্ত্রী পাখিটি তখনো ফুলের পাশেই ছিল। কোনো রকমে দুই-তিনটি ক্লিক করতেই সেও পালিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও পাখি দুটি ফিরে না আসায় কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমের দিকে পা বাড়ালাম। ২৬ জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনা এটি।
বর্ণিল এই পুরুষ পাখিটিকে প্রথম দেখেছিলাম ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। তবে মগডালে গান গাওয়ারত পাখিটির সাক্ষী ছবি ছাড়া ভালো কোনো ছবি তুলতে পারলাম না। ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় স্ত্রী-পুরুষ দুটিকেই একসঙ্গে পেয়ে গেলাম। তবে একটি ভালো ছবি তোলার জন্য আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হলো। ২০১৯ সালের ১৬ মার্চ কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়াতেই পাখিটিকে পেয়ে গেলাম। যদিও পরে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছের টকটকে লাল ফুলের সঙ্গে ওর বেশকিছু চমৎকার ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু হার্ডড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছবিগুলোকে উদ্ধার করতে পারিনি।
আদমপুর, লাউয়াছড়া ও কাপ্তাইয়ে দেখা বর্ণিল এই পাখিটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি বেগুনি-গলা মৌটুসি। বেগুনি-বুক মৌটুসি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম চঁৎঢ়ষব-ঃযৎড়ধঃবফ ঝঁহনরৎফ বা ঠধহ ঐধংংবষঃ’ং ঝঁহনরৎফ। নেকটারিনিইডি (ঘবপঃধৎরহররফধব) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম খবঢ়ঃড়পড়সধ ংঢ়বৎঃধ (লেপটোকোমা স্পারটা)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির সন্ধান মেলে।
ছোট্ট পাখি বেগুনি-গলা মৌটুসির দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ১০ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে ঠোঁটই প্রায় ১.৬ সেন্টিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারায় কোনো মিল নেই। পুরুষটি প্রথম দর্শনে কালচে পাখি। তবে রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ। ঘাড়, পিঠ, ডানা ও লেজ কালচে। দেহের পেছনটা ও কোমার নীল। বুক ও পেটের উপরটা লালচে, তলপেট বাদামি। স্ত্রীর দেহের উপরটা জলপাই-বাদামি ও নিচটা হালকা হলুদ। সাধারণ লোকজনের পক্ষে অন্য প্রজাতির স্ত্রী সানবার্ড থেকে একে আলাদা করা কঠিন। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েরই সরু ও সামনের দিকে বাঁকানো ঠোঁটটি কালো। পা ও পায়ের পাতা কালো। চোখ বাদামি।
এরা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। বনের কিনারা, ছড়ার আশপাশ, বন লাগোয়া আবাদি জমি ও বাগানের ফুলে ফুলে বিচরণ করে নির্যাস পান করে। ছোট ছোট কীটপতঙ্গেও কোনো আপত্তি নেই। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। গায়ক পাখিটি মৃদু ‘চিপ্-চিপ্-চিপ্’ স্বরে ডাকে। পুরুষের তুলনায় স্ত্রী বেশ নীরব। পুরুষ প্রজননের সময় এবং বাসায় ডিম বা ছানা থাকলে খুশিতে গাছের কোনো উঁচু ডালে ওঠে তীক্ষ¥ স্বরে ‘চিহুইট-চিহুইট, টুইট-টুইট-টুইট’ শব্দে গান গায়।
ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় গাছের সরু শাখায় ঘাস, আঁশ, পাতা, বাকল, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে লম্বা থলের মতো ঝুলন্ত বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে দুই থেকে তিনটি বাদামি ছিটযুক্ত ধূসর বা সবুজাভ সাদা ডিম পাড়ে যা স্ত্রী একাই তা দিয়ে ১৪-১৫ দিনে ছানা ফোটায়। বাসা বানানো ও ডিমে তা দেওয়ায় স্ত্রীকে সাহায্য না করলেও পুরুষ তার সুমধূর গানে সবসময় স্ত্রীকে উৎসাহ দেয়। তা ছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে মিলেমিশে সে ছানাদের খাওয়া-দাওয়া ও লালন পালন করে বড় করে তোলে। আয়ুষ্কাল দুই থেকে চার বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
