সন্তানদের অযত্ন অবহেলায় রাজধানী ঢাকায় বৃদ্ধ মা নূরজাহানের করুণ মৃত্যু নিয়ে সারাদেশে যখন আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে ঠিক তখনই বাবা-মা প্রতি কর্তব্য ও শ্রদ্ধা ভালোবাসা এক অনন নজির দেখালেন অন্ধ ভিক্ষুক কাছম আলী।
শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় দেখা গেল বাড়ি থেকে লাঠি ভর করে মাগরিবের নামাজ আদায় ও মিলাদের আয়োজন করতে আসেন কাছম আলী। সঙ্গে দুই প্যাকেট বিস্কুট। মসজিদের গেটের পাশে মুয়াজ্জিন সালেককে পেয়ে তার হাতে থাকা মিলাদের তবারক হিসেবে বিস্কুট আর মিলাদ পরিচালনার জন্য ইমামের সম্মানী টাকা তুলে দেন।
মিলাদ শেষে কথা হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, জীর্ণ পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পড়া যুবক কাছম আলীর (২৯)সঙ্গে । গালে লম্বা কালো দাড়ি, চোখের মনি ছলছল করছে পানিতে। তিনি হবিগঞ্জ সদর উপজেলা দরিয়াপুর গ্রামের ওমর আলী ছেলে। এক সময় তিনি ছিলেন বর্গাচাষি। গত বছর আড়াই মাসের ব্যবধানে মা সাহার বানু বাবা ওমর আলীকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেন কাছম আলী।
স্থানীয়রা জানায়, অন্যান্য ভাই থাকলেও তিনিই বাবা-মাকে লালন পালন করতেন ।
ওমর আলী সাহারবানু দম্পতির ৫ ছেলে ৩ মেয়ে। ২ ছেলে কুদরত আর কুতুব আলী মারা গেছেন আগেই। বাকি তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলেই অন্ধ। বিদেশ ফেরত দ্বিতীয় ছেলে জহুর আলী কৃষি কাজ করেন। কাছম আলী সবার ছোট। তিনি সিলেটে অপর অন্ধ ভাই ইউছুফ আলী চট্টগ্রামে পথে ঘাটে ভিক্ষা করে দিনযাপন করছেন।
এক বছর আগে মা বাবা চিরদিনের জন্য চলে গেলেও কাছম আলীর মনের গহীন থেকে সরে যাননি তারা । তাই তো সিলেট থেকে ছুটে এসেছেন কবর জিয়ারত ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন।
কাছম আলী বলেন, চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হলেও মা বাবার কথা মনে পড়ায় একমুহূর্তেও দেরি না করে চলে এসেছি গ্রামের বাড়িতে। হাতপেতে উপার্জন করা টাকায় আয়োজন করেন মৃত মা বাবার জন্য মিলাদ মাহফিলের।
কাছম আলী জন্মগত অন্ধ নন। কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে হাল চাষ করেছেন জমিতে জানান তিনি । এক পর্যায়ে চোখে ঝাপসা দেখা শুরু হয়। অর্থের অভাবে চিকিৎসা তেমন করাতে পারেননি। একপর্যায়ে চোখের আলো নিভে যায়। সারা পৃথিবী তার কাছে এখন এক অন্ধকার রাজ্য।
একই অবস্থা আরেক ভাই ইউছুফ আলীর। কাছম আলী বিয়ে করেছিলেন। ৫ বছর সংসার ঠিকে ছিল। স্ত্রী তাকে ফেলে চলে গেছেন। নতুন করে সংসার পাতেননি তিনি। ভাই ভাবী ভাতিজা ভাতিজাই এখন তার সব।
কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর্থিক সঙ্গতি থাকার পরেও যে সন্তান জন্মদাতা মা-বাবার লালন পালন খোঁজ খবর করেন না তিনি মানুষ নন। তিনি আমার চেয়েও গরীব।
অন্ধ কাছম আলী ভাবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার আয়ের সব টাকা ব্যাংকে জমা করেছেন ভাবীর নামে। এক/দুই হাজার টাকা নয়, দুই লাখ টাকা।তার মতে ভাবী একজন ভাল নারী। তার নামে টাকা জমা থাকলে কখনোই মার খাবেন না। এলাকায় কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে একটি সামাজিক সংগঠন গঠন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল গরীব দুঃখীদের দাফন কাপনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া ও ওয়াজ মাহফিলে সহযোগিতা করা। এক পর্যায়ে বেশ পরিমান অর্থ জমা হলেও সংগঠনের কতিপয় সদস্যের লোভের কারণে আর এগোয়নি।
মায়ের উপদেশ স্মরণ করে তিনি বলেন, মা যেদিন ভিক্ষা করতে বারন করতেন সেদিন সারাদিনও রুজি হতো না। আজ মাথার উপর আদেশ নিষেধ করার মতো মানুষ নেই। আয়ের জমানো অর্থ দিয়ে কী করতে চান প্রশ্ন করলে তিনি বলেন দেখা যাক সময় আসলে চিন্তা করবো।
