ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে ঝরল ৪৩৮ প্রাণ

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে ঘরমুখো ও কর্মস্থলে ফেরা মানুষের যাতায়াতে গত ১৫ দিনে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বমোট ৪৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৪০ জন আহত হয়েছেন। দেশের গণপরিবহন ও সড়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার সময় ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ঈদুল আজহায় দেশের সড়কগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আলোচ্য সময়ে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া নৌপথের চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক; যেখানে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন।

বিগত বছরের তুলনায় এবারের ঈদে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা ৩.৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩.০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৯.৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোর মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮.৮৩ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় শিকার যানবাহনের তালিকায় মোটরসাইকেলের পরেই রয়েছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান (২১.৪০%), যাত্রীবাহী বাস (১৬.৫৬%), ব্যাটারিচালিত রিকশা (১২.৩৪%), কার ও মাইক্রোবাস (৭.৮১%), নছিমন-করিমন (৬.৫৬%) এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা (৬.৪০%)।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার জন্য সড়ক-মহাসড়কের ত্রুটি, বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট গর্ত, এবং চালকদের আইন অমান্য করার প্রবণতা প্রধানত দায়ী। এছাড়া কিছু পরিবহন মালিক অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়কে নামিয়েছেন। চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালক দিয়েই বিরামহীনভাবে চালানো হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৬.৪৪ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯.১৮ শতাংশ গাড়ি চাপা বা ধাক্কা এবং ১৭.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা। এর মধ্যে ৫০.৫০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটেছে দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোতে।

মানুষের জীবন রক্ষা ও যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে সংবাদ সম্মেলনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, কেবল ঈদের ১০-১২ দিনের তৎপরতা দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। এর জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে উন্নত বিশ্বের আদলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন ও ধীরগতির যানবাহন অপসারণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে 'স্টার' মানের সড়ক নিরাপত্তা করিডোর গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- সাবেক সচিব ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক, সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব অর্পনা রায় দাশ, অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল এবং দপ্তর সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বিটু প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত