চামড়ার ন্যায্য মূল্য থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের জাতীয় রূপান্তর পরিকল্পনার নানা কথা

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

বাংলাদেশে প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়; বরং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো: কোরবানির সময় যে চামড়া অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয় কিংবা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়, সেই একই চামড়া প্রক্রিয়াজাত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেট, বেল্ট ও অন্যান্য ফ্যাশন পণ্যে রূপান্তরিত হয়।

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে সমস্যা কি চামড়ার, নাকি চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনার?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের প্রধান সংকট কাঁচামালের ঘাটতি নয় বরং মূল্য শৃঙ্খলের দুর্বলতা, বাজারের অস্বচ্ছতা, সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব। ফলে চামড়া থেকে সৃষ্ট প্রকৃত মূল্য সংযোজনের বড় অংশ সীমিত পরিসরে কেন্দ্রীভূত থাকে, আর কোরবানিদাতা, মাদরাসা, এতিমখানা ও প্রান্তিক সংগ্রহকারীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চামড়া শিল্পে সাফল্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো কাঁচামাল নয় বরং মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং ও বাজার ব্যবস্থাপনা।

ইতালির উদাহরণ ধরা যাক। ইতালি বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচা চামড়া উৎপাদক নয়, কিন্তু বিশ্বমানের ফ্যাশন ও বিলাসবহুল চামড়াজাত পণ্যের অন্যতম কেন্দ্র। ইতালির সাফল্যের মূল কারণ হলো ডিজাইন, কারিগরি দক্ষতা, ব্র্যান্ডিং ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন। ইতালীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামালের চেয়ে জ্ঞান, নকশা ও ব্র্যান্ডকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে একটি চামড়া থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য আদায় সম্ভব হয়েছে।

তুরস্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি চামড়া শিল্পে আধুনিক শিল্পাঞ্চল, রপ্তানি সহায়তা, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার সংযোগের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে জুতা, পোশাক ও ভ্রমণসামগ্রী উৎপাদনে তারা বৈশ্বিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব অর্জন করেছে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে কেবল ট্যানারি নয় বরং জুতা, ব্যাগ, গ্লাভস এবং ফ্যাশন পণ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি উভয়ই দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ওঠা চামড়া ক্লাস্টার মডেল আজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ।

পাকিস্তানও তুলনামূলকভাবে সীমিত শিল্পভিত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে চামড়াজাত পোশাক, স্পোর্টস গ্লাভস এবং বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্দিষ্ট পণ্যে বিশেষায়ন (স্পেশালিজশন) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে, ভিয়েতনামের সাফল্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটি বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ শ্রমশক্তি উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি গ্রহণের মাধ্যমে জুতা ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভিয়েতনাম প্রমাণ করেছে যে সুপরিকল্পিত শিল্পনীতি থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই একটি দেশ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি পারে না

অবশ্যই পারে। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরও বেশি। দেশে বিপুল কাঁচামাল, বৃহৎ শ্রমশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং তৈরি পোশাক শিল্পে অর্জিত আন্তর্জাতিক বাজার অভিজ্ঞতা সবই রয়েছে। যা প্রয়োজন তা হলো একটি সমন্বিত জাতীয় রূপান্তর পরিকল্পনা।

প্রথমত, একটি জাতীয় চামড়া নীতি ও ২০ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্য শৃঙ্খলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন চামড়া শিল্প উন্নয়ন কমিশন অথবা বোর্ড গঠন করা জরুরি। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একটি বিশেষায়িত কমিশন বা বোর্ড নীতি বাস্তবায়ন, বাজার তদারকি, গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র এবং একটি জাতীয় ডিজিটাল লেদার এক্সচেঞ্জ গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের মতো চামড়ার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল নিলাম ব্যবস্থা চালু করা হলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে।

চতুর্থত, চামড়ার জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বাজারদর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে সরকার বা নির্ধারিত সংস্থা সরাসরি চামড়া ক্রয় করতে পারে। এতে মাদরাসা, এতিমখানা ও সাধারণ বিক্রেতারা ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।

পঞ্চমত, জেলা পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ, মানভিত্তিক গ্রেডিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে। এতে চামড়ার গুণগত মান উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

ষষ্ঠত, পরিবেশবান্ধব ট্যানারি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশগত সম্মতি একটি বড় শর্ত। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীকে পিপিপি’র ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।

সপ্তমত, বাংলাদেশকে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। সেই সঙ্গে চামড়া বা কৃত্রিম চামড়ার আমদানি খুব সীমিত করতে হবে। একটি চামড়া থেকে সর্বাধিক মূল্য সংযোজন করা সম্ভব হয় জুতা, ব্যাগ, ওয়ালেট, জ্যাকেট ও বিলাসবহুল ফ্যাশন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে। চামড়ার এই রূপান্তরের মধ্যেই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিহিত আছে।

অষ্টমত, চামড়া প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইতালি, তুরস্ক ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বলে, দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না।

নবমত, ‘ বাংলাদেশ লেদার’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্প যেমন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পরিচিতিকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি চামড়া শিল্পের জন্যও একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং কর্মসূচি প্রয়োজন।

সবশেষে বাজারে সিন্ডিকেট, কারসাজি ও একচেটিয়া ব্যবসায়িক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও তথ্যনির্ভর বাজার ব্যবস্থাই পারে শিল্পটিকে টেকসই ভিত্তি দিতে।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। যে শিল্প একসময় দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত ছিল, সঠিক নীতি ও নেতৃত্বের মাধ্যমে সেটিকে আবারও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পর চামড়া শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের গল্প।

কোরবানির চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা শুধু একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন। আজ যে চামড়া অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আগামীকাল সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি।

লেখক: সাবেক সভাপতি, ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি), রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত