নীরব করিডোর, ভারী বাতাস। চারদিকে মৃত্যু আর অপেক্ষার গল্প। মর্গের দরজার ওপারে সারিবদ্ধ নিথর দেহ। কেউ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার, কারও ফুটপাতে ভবঘুরে জীবনের অবসান, কেউ আবার নিঃশব্দ মৃত্যুর সাক্ষী। এ মানুষগুলোর নিথর দেহ স্থান পেয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ৪০ বডির মরচুয়ারিকুলারে। এ মরচুয়ারিকুলারে বেওয়ারিশ ও আইনি জটিলতায় আটকে থাকা মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু হঠাৎ মরচুয়ারিকুলারটি বিকল হয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়ে লাশ সংরক্ষণব্যবস্থা। ফলে মরদেহগুলো পচে তীব্র দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে মর্গের পরিবেশ। মর্গের সীমানা পেরিয়ে বিকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে। এতে বিপাকে পড়েন চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থী, রোগী ও রোগীর স্বজনরা।
শুধু তাই নয়; মরচুয়ারিকুলারটি বিকল হওয়ায় একাধিক লাশ কোনো রকমে বরফ দিয়ে যেখানে-সেখানে রাখা হয়েছিল। আর এই সময়ে মর্গে আসা মরদেহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে সংরক্ষণ করেছেন স্বজনরা। তারা ক্ষোভ প্রকাশ বলেন, একটি ফ্রিজ ঠিক করতে আট দিন পার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দেশের অন্যতম প্রধান ফরেনসিক সেবা কেন্দ্রের এমন নাজুক অবস্থা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে জীবিতদের চিকিৎসাসেবায় যেখানে রয়েছে অসংখ্য সংকট, সেখানে মৃতদেহের মর্যাদা কি কেবল আওড়ানো বুলিতে সীমাবদ্ধ?
জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারিগরি সমস্যার কারণে মরচুয়ারিকুলারটি দুই-তিন দিন বন্ধ ছিল। এতে লাশ সংরক্ষণে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। পরে ইঞ্জিনিয়ার এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমস্যা শনাক্ত করেছেন এবং মঙ্গলবার ঠিক করেছেন।’
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, গত ২ জুন মর্গের পাশের মরচুয়ারিকুলারটি হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ওই দিনই ঢামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান ফরেনসিক বিভাগের প্রধান। চিঠিতে লাশ সংরক্ষণ, নিয়মিত ময়নাতদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় চরম অসুবিধার কথা উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে মরচুয়ারিকুলারটি মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কেটে যায় সাত দিনের বেশি।
নিজ ব্যবস্থাপনায় লাশ সংরক্ষণ: ২ জুন রাতে রাজধানীর মুগদা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেইন শুভর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের জন্য ওই রাতেই পুলিশ মরদেহটি এ মর্গে পাঠায়। কিন্তু রাতে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার বিধান না থাকায় এবং পচন ধরায় মরদেহটি তৎক্ষণাৎ ফ্রিজে সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। তবে ৪০ বডির মরচুয়ারিকুলারটি বিকল থাকায় তানভীর হোসেইনের মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। মরদেহ আরও পচে গেলে ‘আলামত’ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে এবং ময়নাতদন্ত করেও মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়বে মৃত তানভীরের পরিবারকে এমনটি জানান মর্গ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু গভীর রাতে লাশ নিয়ে কোথায় যাবেন, কোথায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন, সে চিন্তায় পড়ে মৃতের পরিবার। উপায়ন্তর না পেয়ে লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে এমন একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন মৃতের ভাই তানিম হোসেইন শাওন। সেই অ্যাম্বুলেন্সে পরের দিন দুপুর পর্যন্ত লাশ রাখা হয়।
মৃত তানভীর হোসেইনের ভাই তানিম হোসেইন শাওন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেই রাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা মনে করতে চাই না। একে ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের সবাই শোকে মুহ্যমান। তার ওপর লাশ সংরক্ষণ নিয়ে গভীর রাতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। মর্গসংশ্লিষ্টদের পরামর্শ ছিল, মরদেহ ফ্রিজে না রাখলে আমার ভাই আসলেই নিজে আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এ সংক্রান্ত আলামত নষ্ট হয়ে যাবে। তাই অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেই মরদেহ রাখতে হয়েছে।’ আরও দুই-তিনটি পরিবারকে এমন ঝামেলায় পড়তে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।
তানভীর হোসেইন ছাড়াও ওই সময়ে মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য আনা কয়েকটি মরদেহ নিজ ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করতে হয়েছে মৃতের পরিবারকে। ৩ জুন লালবাগ থেকে আনা আরেকটি মরদেহ সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে একইভাবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মর্গের সামনেই অপেক্ষা করতে থাকেন স্বজনরা। এ দুটি মরদেহ ছাড়াও আরও কয়েকটি মরদেহ এভাবে নিজ ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করেছেন মৃতের পরিবার এমনটি জানিয়েছেন মর্গসংশ্লিষ্টরা।
মরদেহ রাখা হয় এখানে-সেখানে : মরচুয়ারিকুলারটি বিকল হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাতে ছয়টি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ, চারজন বিদেশির (তিনজন ভারতীয়, একজন দক্ষিণ আফ্রিকার) মরদেহ এবং ১২ বছর ধরে মর্গে পড়ে থাকা খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর মরদেহসহ কয়েকটি মরদেহ ছিল। মরচুয়ারিকুলারটি বিকল হওয়ার পর খোকন নন্দী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নারী থিইসিয়া সিকেওয়েস্টের মরদেহ জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়। আর কারাগারে বন্দি থাকাকালে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া ভারতীয় তিন নাগরিক পিন্টু কুমার, লালমোহন ও জীবন দে’র মরদেহ রাখা হয় বার্ন ইনস্টিটিউটের মর্গের ফ্রিজে। বাকি দুই নারী, এক নবজাতকসহ অজ্ঞাত পরিচয়ের ছয় মরদেহ পড়ে থাকে বিকল মরচুয়ারিকুলারেই। পচা গন্ধ ছড়ালে মরদেহগুলো রাখা হয় কমপ্লেক্স ভবনে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কমপ্লেক্স ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, একটি রুমের ফ্লোরে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে লাশগুলো। কয়েকটি রাখা হয়েছে লাশ পরিবহনের ট্রলিতে। লাশগুলো বরফ দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এতেও কাজ হয়নি। অনেকটাই পচে গেছে ছয়টি মরদেহ। বিকট দুর্গন্ধে ওই কক্ষে প্রবেশ করাই দায়।
বাতাসে বিকট দুর্গন্ধ : অসংখ্য ভাঙা পরিবারের নীরব সাক্ষী, অপ্রকাশিত আর্তনাদের এক ভারী ঠিকানা ‘মর্গ’, যেখানে কেউ স্বেচ্ছায় আসে না, আসে প্রয়োজনের তাগিদে, শেষবারের মতো কাউকে শনাক্ত করতে কিংবা একটি কঠিন সত্য মেনে নিতে। সেই মর্গ প্রাঙ্গণে পা রাখতেই ভেসে আসে মরা লাশের বিকট দুর্গন্ধ। শুধু মর্গে নয়; সীমানা পেরিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে।
সরেজমিন গিয়ে টের পাওয়া গেছে, ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের পাশ ঘেঁষে মেডিকেল কলেজের দিক যেতেই বিকট দুর্গন্ধ। মেডিকেল কলেজ, শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাসে, ফরেনসিক বিভাগে, ডোমদের থাকার কক্ষে, মর্গের পেছনে পরমাণু শক্তি কমিশন ভবনের অংশে, এ পথে মূল সড়কেও ছড়িয়ে পড়েছে লাশের পচা দুর্গন্ধ। মর্গের দিক যেতে দুর্গন্ধ সহজেই বাতাসের সঙ্গে নাকে ভেসে আসে। দুপুর ১টার দিকে মুখে মাস্ক আর সাদা অ্যাপ্রোন পরিহিত একদল শিক্ষার্থী মর্গের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের কেউ কেউ মাস্কের উপর দিয়েও নাক চেপে ধরছিলেন।
ইয়ামিন নামের এক শিক্ষার্থী জানান, তারা আজগর আলী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। গত চার দিন ধরে তারা ঢামেক ফরেনসিক বিভাগে আসেন এবং হাতে-কলমে মরদেহের ময়নাতদন্ত কার্যক্রম দেখেন ও শিখেন। চার দিনে লাশপচা গন্ধে টিকতে পারছিলেন না। আগে কখনো এত দুর্গন্ধ পাননি তারা।
এরই মধ্যে খুনের শিকার রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদারের মরদেহ ময়নাতদন্ত করতে মর্গে নিয়ে যায় পুলিশ। মরদেহ কমপ্লেক্স কক্ষে নিতে সেখানে হাজির হন ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের একদল শিক্ষার্থী। গন্ধে তারাও টিকতে পারছিলেন না। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ব্যবহারিক শিক্ষার অংশ হিসেবে তাদের প্রায় প্রতিদিনই লাশ কাটা ঘরে যেতে হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিকট গন্ধে কাজই করতে পারছেন না। মরচুয়ারিকুলার বিকল হয়ে লাশ পচে যাওয়ায় এত দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। এমন দুর্গন্ধে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা বিষাক্ত গ্যাস থাকে, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁঁকি ও রোগের কারণ। অথচ শিক্ষার্থীরাই এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন সুমন শেখ বলেন, আগেও বহুবার হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু এত গন্ধ কখনো পাননি। কিসের এত গন্ধ, তা জানতে চান তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে।
যে কারণে বিকল : আট দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার বিকল মরচুয়ারিকুলারটি ঠিক করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে একটি কোম্পানির মিস্ত্রি আরিফ এসে এটি ঠিক করেন। আরিফ দেশ রূপান্তরকে জানান, মরচুয়ারিকুলারটির সার্কিট কন্ট্রোলার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুতের ভোল্টেজ আপ-ডাউনের কারণে এটির ফেস কেটে গেছে। পরে বিদ্যুৎ এলে এটি চালু হলেও গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যেত। গত বৃহস্পতিবার সমস্যা শনাক্ত করে তাকে সার্কিট কন্ট্রোলার বুঝিয়ে দেওয়ার পর গতকাল ঠিক করেন।
ঠিক করার কয়েক ঘণ্টা পর মরদেহ ভেতরে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। বিকেল ৩টার দিকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ছয় মরদেহ আগের মতো সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মর্গের ইনচার্জ রামু। তিনি জানান, কয়েকটি লাশ অনেকটা পচে গেছে। সেগুলো পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর এতদিন কমপ্লেক্স ভবনে এসি ছেড়ে এবং বরফ দিয়ে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। এ ছয় মরদেহ আজ বুধবার দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের ডিউটি অফিসার কামরুল ইসলাম।
জানা গেছে, ৪০ বডির এ মরচুয়ারিকুলারটি ২০২১ সালে ঢামেক কর্তৃপক্ষকে প্রদান করে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। ২০২১ সালে করোনায় বহু লোক প্রাণ হারান। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে পরিবারের কেউ স্বজনের মরদেহের কাছে যেতেন না, দাফনও করতেন না। ফলে অসংখ্য মরদেহ হাসপাতালে জমে থাকে। আর এত মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খেতে হতো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। লাশ সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে মরচুয়ারিকুলারটি ঢামেক কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হয়।