পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য ৪৫ বছর ধরে বিনামুল্যে গাছ দিয়ে বেড়াচ্ছেন মাদারীপুরের রাজন মাহমুদ। যার ধ্যান, জ্ঞান, প্রেম সবই গাছকে ঘিরে। পকেটে টাকা না থাকলেও তিনি অনেক সময় ধার করে হলেও গাছের পিছনে ব্যয় করেন। বিনা টাকায় গাছের চারা বিতরণের পাশাপাশি ‘পরিবেশ বাচাও’ যুদ্ধে নেমেছেন তিনি। পুকুর, খাল, পাখি রক্ষার ব্যাপারেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য জেলায় অনেকেই তাকে পরিবেশবাদী বলে চিনেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার ২নং শকুনী এলাকার আনোয়ার হোসেন খান ও সুলতানা রিজিয়ার বড় ছেলে রাজন মাহমুদ। তার কিশোর বয়স থেকেই গাছের প্রতি আলাদা একটা আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তার গাছের জন্য প্রবল ভালোবাসার জন্ম হয়। এরপর ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে বাবা আনোয়ার হোসেন খান ও ছেলে রাজন মাহমুদ শখের বশেই গড়ে তোলেন ব্যক্তিগত নার্সারী। সেই নার্সারীতে তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন চারা বিনা টাকায় বিতরণ করা হতো মানুষজনের মধ্যে। তাছাড়া যার যখন যেই গাছটি পছন্দ হতো, তা চাইলেও তাদের দেওয়া হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো।
এভাবেই দীর্ঘ দিন পর ২০০১ সালে ‘নিউজ ফরম ইসরাইল’ নামে একটি মাসিক পত্রিকায় পরিবেশের উপর বিভিন্ন সংবাদ পড়ে প্রেরণা পেয়ে তিনি তৈরি করেন একটি সংগঠন। নাম দেন ফ্রেন্ডস অভ নেচার। যা মাদারীপুর জেলায় একমাত্র পরিবেশবাদী সংগঠন হিসেবে খ্যাতি ও পরিচিতি রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় এমপি মাদারীপুর শহরের ১নং পুলিশ ফাড়ি সংলগ্ন পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি ভরাট করতে চাইলে প্রথমে প্রতিবাদ জানান তার সংগঠন ফ্রেন্ডস অভ নেচারের ব্যানারে রাজন মাহমুদ। পরবর্তীতে তৎকালিন মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেই পুকুর ভরাট থেকে রক্ষা পায়। দীর্ঘ বছরের কাজের পরিধিতে এমন উদাহরণ রয়েছে অনেক।
এছাড়াও রাজন মাহমুদ পাখি রক্ষার জন্য বিভিন্ন গাছে গাছে মাটির হাড়ি দিয়ে পাখির বাসা বানিয়ে দিয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন বিলে নিজ টাকায় মাছের রেনু পোনা কিনে অবমুক্ত করেন। বিভিন্ন সময় খাল ভরাট এবং পানি নিস্কাশনের ড্রেনেস সিস্টেম বন্ধ থাকার প্রতিবাদ করায় জেলায় তাকে পরিবেশবাদী বলে চিনে থাকেন। এছাড়াও জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থান, বিলুপ্ত গাছ, মাছ, জীবজন্তুসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে নেমে পড়েন তিনি।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজন মাহমুদের বাড়ির ছাদে রয়েছে নানা ফুল ও ওষুধি গাছের সংগ্রহ। রয়েছে বিভিন্ন জাতের ক্যাকটাস। বাড়ির পাশে পারিবারিক জায়গায় গড়ে তুলেছেন নার্সারী। এখান বসে তিনি বিভিন্ন চারা উৎপাদন করেন। তাকে এই কাজে সহযোগিতা করেন বিদেশ ফেরত প্রতিবেশি সাখাওয়াত হোসেন মামুন ও স্থানীয় নুরু খা। বর্তমানে তিনজন মিলে বিভিন্ন চারা উৎপাদন করে পরে তা বিনামূল্যে বিতরণ করেন। শহরের অনেকেই বাড়িতে গাছ লাগাতে চাইলেও মাটির অভাবে লাগাতে পারেন না। সেক্ষেত্রেও তিনি নিজে মাটি কিনে, টপ কিনে গাছ লাগানোর উপযোগি করেন। পরে এগুলো তাদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
এছাড়াও তার বাড়ির পিছনে রয়েছে সবজির বাগান। সেখানেও তিনি নানা ধরণের সবজি চাষ করেন। বর্তমানে তিনি মাদারীপুর কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ৫০০ বস্তায় আদা চাষের কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই আদা চাষ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে রাজন মাহমুদ বলেন, আমরা আমাদের উপকারী কাছের বন্ধু বিভিন্ন ভেষজ গাছের উপর থেকে আস্তা হারিয়ে এলোপেথিক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়েছি। অথচ আমাদের দাদা-দাদীর যুগে তারা গাছ গাছড়া ভেষজ চিকিৎসার উপরে নির্ভরশীল ছিলেন। এজন্য তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন এবং নিরোগ দেহে দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। ফ্রেন্ডস অভ নেচারের আগামী দুই বছরের পরিকল্পনা মাদারীপুর জেলায় প্রতিটি বাড়িতে বিনা মূল্যে ১০টি ভেষজ গাছ জন্মাবার নিশ্চয়তা প্রদান। নিম. উলটকম্বল, পাথরকুচি, বাসক, তুলসী, কালোমেঘ, দুধআকন, গন্ধভাদালী, এলোভেরা, আমলকী, নিম, অর্জুন, অগ্নিশ্বর, তেলাকুচা ও গাদা ফুল, নয়নতারা, জবা, অপারাজিতা যা অযত্ন অবহেলায় বেড়ে উঠে এবং, মানুষের সাধারণ কিছু প্রতিনিয়ত হওয়া রোগের নিরাময়ের কাজে লাগে। ভেষজ চিকিৎসার কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। প্রতিটি মানুষকে পরিবেশ সচেতন, স্বাস্থ্য সচেতন, পুষ্টি সচেতন এবং দুর্নীতি মুক্তি হওয়ার চেষ্টায় ফ্রেন্ডস অভ নেচারের আন্দোলন। তিনি আশা করেন একদিন সবাই এই আন্দোলনে সমস্ত তরুণ ও যুব সমাজ সহ সকল জেলাবাসী সম্পৃক্ত হবে এবং মাদারীপুরসহ সারা বাংলাদেশ সুন্দর সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
গাছ লাগানোর সহযোগি সাখাওয়াত হোসেন মামুন বলেন, সদর উপজেলার ২নং শকুনী এলাকায় মায়াবন নামে তার বাসভবনের ছাদে ও পাশে অনেক গাছ লাগিয়েছেন। দীর্ঘদিন বিদেশ থাকার পর দেশে আসি। এসে তার এই গাছ ও বিনামূল্যে গাছ বিতরণসহ পরিবেশ নিয়ে কাজ করা দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। পরে আমিও তার সাথে এই কাজ শুরু করি।
মাদারীপুরের হাজির হাওলা গ্রামের মিথিলা মোহসিন বলেন, আমার কিছু টপের প্রয়োজন হয়। রাজন মাহমুদ তা ফেসবুকের মধ্যেমে জানতে পারেন। পরে তিনি আমাকে ২০টি টপ দিয়েছেন। শুধু টপ না, টপের মধ্যে গাছ লাগানোর জন্য প্রক্রিয়াধীন মাটিও ছিল। সেই সাথে তার ছাদ বাগান থেকে বেশ কিছু গাছও আমি বিনা টাকায় নিয়ে যাই। বর্তমান যুগে কেউ টাকা ছাড়া এভাবে গাছ দেয় না।
মাদারীপুর ২নং শকুনি এলাকার রাবেয়া সুলতানা বলেন, আমি তার কাছে বিভিন্ন ফুল গাছের ডাল চাইলে তিনি বিনামূল্যে অনেকগুলো গাছ টপসহ দিয়ে দেন।
আরেক বাগানী মেহেদী হাসান রকিব বলেন, বর্তমানে কেউ টাকা ছাড়া এমনি এমনি গাছ দেয় না। কিন্তু রাজন মাহমুদকেই দেখলাম তিনি বিনা টাকায় গাছ দিয়ে থাকেন। তাকে দেখে আমি এই ব্যাপারে উৎসাহ পাই।
সদর উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজন মাহমুদের সাথে পরিচয়। তিনি আমাদের সহযোগিতায় ৫০০ বস্তায় আদা চাষের প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই আদা চাষ শেষ হয়েছে। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিনা টাকায় গাছ দিয়ে থাকেন। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। একটি গাছও যদি বেচে থাকে, তাহলে তা পরিবেশ রক্ষার জন্য কাজ করে। তাকে দেখে অন্যরা গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ হবেন।