চৌদ্দগ্রামে ছেলের বিল্ডিংয়ে ঠাঁই হলো না বৃদ্ধা মায়ের

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁইও মিলল না নিজের ছেলের নতুন নির্মিত বিল্ডিং ঘরে। ৯৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা ছামেনা খাতুনকে একমাত্র ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুত্রবধূর বিরুদ্ধে। 

বর্তমানে তিনি মেয়ের জরাজীর্ণ বসতঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘটনাটি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ছামেনা খাতুনের জন্ম ১৯৩১ সালের ২২ নভেম্বর। তার স্বামী আবদুল হক ২০০৮ সালে মারা যান। তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ ২০০৬ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত। 

পরিবারের একমাত্র পুত্র হওয়ায় বার্ধক্যে ছেলের আশ্রয় ও সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার ভাগ্যে জুটেছে অবহেলা ও অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই ছামেনা খাতুনের জীবন সংগ্রামময় হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে ছেলে ফয়েজ আহমেদ তাকে নিজের বাড়ি থেকে পাশের বাড়িতে বসবাসকারী মেয়ে রোকেয়া বেগমের কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে মেয়ের বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি।

রোকেয়া বেগম নিজেও স্বামীহারা। সীমিত আয়ের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটালেও বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্থানীয়রা জানান, আর্থিক সংকটের মধ্যেও মেয়ের পরিবার কখনো বৃদ্ধাকে অবহেলা করেনি।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে ফিরে ছেলে ফয়েজ আহমেদ নতুন একটি বিল্ডিং ঘর নির্মাণ করেন। গ্রামবাসীর অনুরোধ ও সামাজিক চাপের মুখে তিনি মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল যে জীবনের শেষ সময়টা হয়তো ছেলে ও নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে কাটাতে পারবেন ছামেনা খাতুন।

কিন্তু সেই আশা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত ৪ মে ফয়েজ আহমেদ পুনরায় সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়। 

অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী রুমা বেগম গভীর রাতে ছামেনা খাতুনের ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ তাকে আবার মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে তিনি মেয়ের ঘরেই অবস্থান করছেন।

বৃদ্ধা ছামেনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “অনেক বছর আগে ছেলে আমাকে নিজের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তারা আমার কোনো খোঁজখবর রাখে না। মেয়েরাই আমাকে দেখাশোনা করে। এখন বয়স হয়েছে, চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। জীবনের শেষ সময়ে একটু শান্তিতে থাকতে চাই।”

মেয়ে রোকেয়া বেগম বলেন, “আমার ভাই ও ভাবি দীর্ঘদিন ধরে মায়ের প্রতি অবহেলা করে আসছেন। আমাদের সংসারে অভাব আছে, কিন্তু মাকে কখনো ফেলে দিইনি। ভাই দেশে এসে মাকে নতুন ঘরে তুলেছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম মায়ের কষ্টের দিন শেষ হবে। কিন্তু ভাই বিদেশে যাওয়ার পরদিনই ভাবি মাকে আবার বের করে দেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল খায়ের বলেন, “গ্রামের মানুষ অনুরোধ করেছিল বলেই ফয়েজ আহমেদ মাকে নিজের বাড়িতে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পরদিনই তার স্ত্রী বৃদ্ধাকে বের করে দেন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যে মেয়ের বাড়িতে তিনি আছেন, সেই পরিবারও আর্থিকভাবে অসচ্ছল।”

আরেকাধিক গ্রামবাসী জানান, বার্ধক্যজনিত কারণে ছামেনা খাতুন বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হলেও তার সেই সুযোগ নেই। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে বৃদ্ধার জীবনযাত্রার কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফয়েজ আহমেদের স্ত্রী রুমা বেগমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসীর দাবি, জীবনের শেষ সময়ে একজন মায়ের প্রতি এমন আচরণ শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিকভাবেও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তারা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং বৃদ্ধার নিরাপদ ও সম্মানজনক বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশর বলেন, “বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। খোঁজখবর নিয়ে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব।”

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহাদাৎ হোসেন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি বৃদ্ধা ছামেনার ভরণপোষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়টিও দেখা হবে।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত