অবশেষে জনদাবির মুখে দখলমুক্ত হলো নিকুঞ্জের সেই খেলার মাঠ

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

প্রায় এক বছর ধরে চলা বিতর্ক, এলাকাবাসীর ধারাবাহিক আন্দোলন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত একের পর এক প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক তৎপরতার পর অবশেষে দখলমুক্ত হয়েছে রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ। গত ৮ জুন পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে শুধু মাঠের ভেতরের বিতর্কিত স্থাপনাই নয়, নিকুঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও জনপরিসর থেকেও অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে উচ্ছেদ অভিযানের পর স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় আবারও দখলদারিত্ব ফিরে আসার চেষ্টা হতে পারে।

সন্ধ্যার পর মাঠে এখন আবার দেখা যাচ্ছে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, কিশোরদের ক্রিকেট-ফুটবল আর তরুণদের প্রাণচাঞ্চল্য। অনেক দিন পর মাঠের চারপাশে ফিরেছে সেই পরিচিত প্রাণের স্পন্দন, যা একসময় নিকুঞ্জের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় এক বছর আগে মাঠের উত্তর পাশের একটি বড় অংশজুড়ে ফুড কোর্টের নামে অসংখ্য দোকান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, জনস্বার্থ উপেক্ষা করে একটি চক্র মাঠের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে সেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এর ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে।

এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি জনপরিসরে আলোচিত হয়।

এর আগে একাধিক উচ্ছেদ উদ্যোগ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তবে সর্বশেষ গত ৮ জুন প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানে মাঠের ভেতরের বিতর্কিত স্থাপনাগুলো অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে নিকুঞ্জের বিভিন্ন সড়ক ও জনপরিসরে গড়ে ওঠা অবৈধ দখলও উচ্ছেদ করা হয়।

‘মাঠ ফিরে পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন’

নিকুঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা সজল করিম বলেন, এই মাঠটা শুধু খেলার জায়গা নয়, এটি আমাদের এলাকার প্রাণ। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, তরুণদের বিকাশ এবং মানুষের সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠের অবস্থা দেখে কষ্ট পেয়েছি। আজ মাঠ ফিরে পাওয়ার আনন্দ সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

তিনি বলেন,  ভবিষ্যতে কোনো অজুহাতে আবার মাঠের চরিত্র বদলে দেওয়া, এটা আমরা চাই না।

‘মোবাইলের বাইরে শিশুদের একটি পৃথিবী দরকার’

মাঠে ক্রিকেট খেলতে আসা তরুণ আসিফ শাহরিয়ার বলেন, অনেক দিন পর আবার খেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পেয়েছি। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি মাঠ না পায়, তাহলে সুস্থ বিনোদনের সুযোগও হারিয়ে ফেলবে।

তিনি বলেন, এই মাঠকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি খোলা জায়গা রক্ষা করা নয়, একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা।

‘মাঠের পরিচয় মাঠ হিসেবেই থাকতে হবে’

নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সোসাইটির বর্তমান প্রশাসক ইনসান আলী বলেন, একটি আবাসিক এলাকায় খেলার মাঠের বিকল্প নেই। নগরায়ণের চাপে উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ার এই সময়ে মাঠকে মাঠ হিসেবেই রাখতে হবে।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে মাঠ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

‘জনস্বার্থবিরোধী দখলদারিত্ব বরদাস্ত করা হবে না’

উচ্ছেদ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী  খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো দখলদারিত্ব বা অবৈধ কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। জনগণের স্বার্থে আইনগতভাবে যা করণীয়, তা করা হবে।

তিনি বলেন, পুনরায় অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুনর্বাসনের আশ্বাসে এনআইডি সংগ্রহের অভিযোগ

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন একটি অভিযোগ সামনে এসেছে।

এলাকাবাসীর একাধিক সূত্র দাবি করেছে, একটি রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কতিপয় ব্যক্তি উচ্ছেদ হওয়া কিছু হকার ও দখলদারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি সংগ্রহ করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের বলা হচ্ছে-বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবেদন বা ফরম পূরণের মাধ্যমে আবারও বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এলাকাজুড়ে আলোচনা চলছে।

একাধিক বাসিন্দা বলেন, যদি এমন কোনো উদ্যোগ সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে তা সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

‘কোনো রাজনৈতিক সাইনবোর্ডে আর মাঠ বা ফুটপাত দখল হতে দেব না’

স্থানীয় বাসিন্দা রানা ইব্রাহিম বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, কোনো সংগঠনের ব্যানার কিংবা কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকার মাঠ বা ফুটপাত আর দখলের সুযোগ দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, যে মাঠ ফিরে পেতে এলাকাবাসীকে এক বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে, সেটি আবার দখল হয়ে যাবে-এটা আমরা মেনে নেব না।

আরেক বাসিন্দা বলেন, আইনের শাসন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জনসম্পদ দখল করবে-এমন সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।

জনগণের ‘ঐক্যের শক্তি’

স্থানীয়দের মতে, নিকুঞ্জের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই শেষ পর্যন্ত মাঠটি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তাদের ভাষ্য, জনস্বার্থের প্রশ্নে সংগঠিত হওয়ার একটি ইতিহাস রয়েছে নিকুঞ্জবাসীর।

গত বছরের ৩০ এপ্রিল দীর্ঘ আন্দোলন ও জনমতের চাপে এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল।

স্থানীয়দের দাবি, সেই উদ্যোগ পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানে নাগরিক উদ্যোগের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

স্থানীয়রা বলেন, নিকুঞ্জবাসী যখন কোনো যৌক্তিক দাবিতে একত্রিত হয়, তখন পরিবর্তন সম্ভব হয়। মাঠ রক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা একইভাবে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকব।

এখন প্রয়োজন স্থায়ী সুরক্ষা

নগর বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, রাজধানীতে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যমান মাঠগুলো সংরক্ষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মাঠ ও জনপরিসর রক্ষায় নিয়মিত তদারকি, সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

গত ৮ জুন উচ্ছেদ অভিযানের পর মাঠে আবার ফিরেছে খেলাধুলার প্রাণ। শিশুদের হাসি, কিশোরদের উচ্ছ্বাস এবং অভিভাবকদের স্বস্তিমাখা উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে-একটি খেলার মাঠ শুধু জমির একটি খণ্ড নয়, এটি একটি এলাকার সামাজিক জীবন, মানবিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে সেই অর্জন টেকসই হবে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। আর সে কারণেই নিকুঞ্জবাসীর প্রত্যাশা-দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হওয়া মাঠ ও জনপরিসর আর কখনো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দখলের শিকার হবে না। বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ নাগরিক সম্পদ হিসেবেই সংরক্ষিত থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত