বাজেট হলো আমাদের জাতীয় আয়না। সেখানে শুধু রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের হিসাবই থাকে না; সময়ের মুখ, মানুষের উদ্বেগ, সরকারের অঙ্গীকার এবং অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দনও থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সেই অর্থে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। আকারে এটি প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। বড় অঙ্কের বাজেট মানেই কিন্তু বড় সক্ষমতা বুঝায় না। বাজেটের আসল পরীক্ষা হয় বাজারে, ব্যাংকে, কারখানায়, খেত-খামারে, রপ্তানি আদেশে, তরুণ-তরুণীদের চাকরির খোঁজে এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
এই বাজেটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন তাই খুব সহজ: সরকার কি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ সামলিয়ে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
প্রবৃদ্ধি: উচ্চ লক্ষ্যের সামনে দুর্বল বাস্তবতা
প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। আশাবাদী লক্ষ্য নি:সন্দেহে, সেই সাথে উচ্চাভিলাষীও বটে। কারণ গত কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধির ধারা নিম্নমুখী। সাম্প্রতিক অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে। উন্নয়ন সহযোগীরাও চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে থাকার আশঙ্কা করেছে।
প্রবৃদ্ধি আসলে নদীর স্রোতের মতো। স্রোত বাড়াতে হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি, ভোগ এবং আস্থা একসঙ্গে চলতে হয়। অথচ বর্তমানে ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ শিল্প উৎপাদনকে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও সংসদে বলেছেন যে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিনিয়োগ, শ্লথ বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তাই ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে শুধু বাজেট ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, আমদানির স্বাভাবিকতা, ব্যাংক ঋণের প্রবাহ, রপ্তানির সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের সাহস ফিরে আসা।
মূল্যস্ফীতি: অদৃশ্য করের ভার
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি সূচক, কিন্তু মানুষের জীবনে এটি প্রতিদিনের ক্ষয়। মূল্যস্ফীতি আসলে গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর আরোপিত এক ধরনের অদৃশ্য কর।
বেতন বা আয় অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা এবং ভাড়ার খরচ বাড়ে। ফলে কর না দিয়েও মানুষ করের মতোই ক্ষতি বহন করে।
এই বাজেটে কিছু কর ছাড়ের প্রস্তাব আছে। করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে তা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার রূপরেখাও থাকতে পারে। এটি মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তির। কিন্তু বাজারে যদি দাম না কমে, তাহলে করছাড়ের স্বস্তি মুদির দোকানেই হারিয়ে যাবে।
রাজস্ব: বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল সেতু
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব। মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে এনবিআর আদায় করেছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। যেখানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। ঘাটতি প্রায় ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের বর্তমান সক্ষমতা ও আগামী বছরের লক্ষ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মানে হলো অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু সরকারের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। করের আওতা অনেক কম, কর প্রশাসন অত্যন্ত জটিল, আর কর ফাঁকি ব্যাপক এবং করদাতাদের আস্থাও বেশ দুর্বল।
রাজস্ব বাড়াতে হলে শুধু করের হার বাড়ালেই হবে না। করজাল বাড়াতে হবে, কর আদায় সহজ করতে হবে, ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং করদাতাকে সন্দেহের চোখে না দেখে বরং অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
করনীতি: স্বস্তি, শৃঙ্খলা ও চাপের মিশ্রণ
প্রস্তাবিত বাজেটে করনীতিতে দ্বৈততা আছে। একদিকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত রাখার ইঙ্গিত আছে। রপ্তানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামানো হতে পারে। বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাবও থাকতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ১৫০ সিসির বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনেও টিআইএন প্রয়োজন হতে পারে। খুচরা পর্যায়ে অগ্রিম কর আরোপের উদ্যোগ আছে। অর্থাৎ সরকার করদাতার সংখ্যা বাড়াতে চাইছে।
এখানে সতর্কতা জরুরি। করজাল বাড়ানো দরকার, কিন্তু তা যেন আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা না হয়। ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করলে অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থী, ভাতাভোগী, পেনশনভোগী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ছাড় থাকা দরকার।
বাজেট ঘাটতি: অঙ্কে সহনীয়, বাস্তবে সংবেদনশীল
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৫৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিকভাবে ৫ শতাংশের নিচে ঘাটতি সাধারণত সহনীয় ধরা হয়। সে দিক থেকে এই অঙ্কটি উদ্বেগজনক নয়।
কিন্তু ঘাটতির প্রকৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘাটতি কীভাবে অর্থায়ন হবে? যদি বড় অংশ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসে, তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে চাপে পড়বে।
প্রস্তাবিত হিসাবে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসতে পারে।
এতে একটি পরিচিত ঝুঁকি তৈরি হয়: সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীরা কম ঋণ পান। বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন কমে। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট। সাধারণ ভাষায়, বড় হাতি যখন জলাশয়ে নামে, ছোট প্রাণীদের পানযোগ্য পানি কমে যায়।
সুদের ব্যয়: ঋণের নীরব পাহাড়
বাজেটের আরেকটি বড় চাপ হলো সুদের ব্যয়। আগামী অর্থবছরে সুদ পরিশোধে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। গত অর্থবছরে সুদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু প্রকৃত ব্যয় পৌঁছায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরেও তা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সুদের ব্যয় হলো অতীত ঋণের বর্তমান মূল্য। এই অর্থ দিয়ে নতুন রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল বা কর্মসংস্থান তৈরি হয় না; এটি আগের ধার শোধের খরচ। যখন বাজেটের বড় অংশ সুদ, ভর্তুকি ও বেতন-ভাতায় চলে যায়, তখন উন্নয়ন ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত হয়।
এ বছর সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা আছে। বেতন, ভাতা ও পেনশন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে সুদ ও ভর্তুকি যোগ করলে পরিচালন বাজেটের বড় অংশই বাধ্যতামূলক ব্যয়ে আটকে যাবে।
বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা: দরকার, কিন্তু শর্তসহ
বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপরও বড় ভরসা রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের কথা আছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হতে পারে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নতুন ঋণ ছাড়াই করা হচ্ছে।
বৈদেশিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, কারণ অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বৈদেশিক ঋণেরও নিজস্ব দায় আছে। প্রকল্প নির্বাচন ভুল হলে, বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে বা ঋণের শর্ত কঠিন হলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ে।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রধান কাজ হলো, বৈদেশিক ঋণ এমন প্রকল্পে ব্যবহার করা যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ায় এবং ভবিষ্যতে আয় তৈরি করে। ঋণ যদি আয় সৃষ্টি না করে, তবে তা একসময় জনগণের কাঁধে বোঝা হয়ে ফিরে আসবে।
এডিপি: বরাদ্দ বড়, আর বড় প্রশ্ন হলো বাস্তবায়নযোগ্য কিনা
আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।
কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, এডিপির সমস্যা বরাদ্দে নয়, বাস্তবায়নে। বছরের শুরুতে প্রকল্প ধীরগতিতে চলে, বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে খরচ করা হয়। এতে ব্যয়ের গুণমান কমে, প্রকল্পের খরচ বাড়ে এবং জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পায় না।
এডিপি সফল করতে হলে প্রকল্প বাছাই কঠোর করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, অর্থনৈতিক লাভের বিবেচনায় প্রকল্প নিতে হবে। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রপ্তানি অবকাঠামোতে জোর দেওয়া দরকার।
রিজার্ভ: স্থিতিশীলতার নোঙর
বাজেট আলোচনায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সরাসরি শিরোনামে আসে না, কিন্তু এটি অর্থনীতির একটা নোঙর। রিজার্ভ দুর্বল হলে আমদানি, জ্বালানি, ঋণ পরিশোধ এবং মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে ডলার সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওঠানামা এবং রপ্তানি আয়ের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রিজার্ভ শক্তিশালী না হলে বাজেটের বৈদেশিক ঋণ পরিকল্পনা, আমদানি সক্ষমতা এবং বিনিময় হার সবই অনিশ্চয়তায় পড়ে।
রিজার্ভ বাড়াতে শুধু ঋণ যথেষ্ট নয়। দরকার রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। রিজার্ভ হলো অর্থনীতির পানির ট্যাংক। বৃষ্টি না হলে ট্যাংক ভরে না, আর শুধু ধার করা পানি দিয়ে দীর্ঘদিন চলে না।
বিনিময় হার: টাকার মান ও মানুষের জীবন
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন শিল্প, আমদানি, ঋণ পরিশোধ এবং মূল্যস্ফীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, টাকার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ সুদহার কর্পোরেট খরচ বাড়িয়েছে এবং বড় করদাতাদের মুনাফা কমিয়েছে।
টাকা দুর্বল হলে রপ্তানিকারক কিছু সুবিধা পেতে পারেন, কিন্তু আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব দ্রুত বাজারে পড়ে। জ্বালানি, সার, খাদ্য, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বেশি দাম দিতে হয়।
তাই বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় বাস্তবতার ছোঁয়া থাকা দরকার। কৃত্রিমভাবে টাকার মান ধরে রাখা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি হঠাৎ বড় অবমূল্যায়নও ক্ষতিকর। স্বচ্ছ, ধাপে ধাপে এবং বাজারসম্মত বিনিময় হার নীতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: বাজেটের প্রাণ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ঘাটতি, ডলারের অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা উদ্যোক্তাদের সতর্ক করে তুলেছে।
বাজেটে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য ডি-রেগুলেশনের কথা আছে। ব্যবসার লাইসেন্স ও নবায়নের মেয়াদ পাঁচ বছর করা হতে পারে। মুঠোফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম, সিসিটিভি ক্যামেরা, সেমিকন্ডাক্টর ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে কর-শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব আছে। এসি ও ফ্রিজ উৎপাদনে ভ্যাট কমানো এবং মুঠোফোন উৎপাদনে অগ্রিম কর কমানোর উদ্যোগও আছে।
এসব পদক্ষেপ শিল্পায়নের পক্ষে ইতিবাচক। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় জ্বালানি হলো আস্থা। উদ্যোক্তা শুধু কর ছাড় দেখে বিনিয়োগ করেন না; তিনি দেখেন নীতি কতটা স্থিতিশীল, ব্যাংক ঋণ কতটা সহজ, গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না এবং আইন প্রয়োগ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য।
কর্মসংস্থানও এখানে কেন্দ্রে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। প্রবৃদ্ধি যদি চাকরি তৈরি না করে, তবে তা সমাজে হতাশা বাড়ায়। বাজেটে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য ৫০০ কোটি টাকার উদ্যোগ সময়োপযোগী।
চলচ্চিত্র, সংগীত, সফটওয়্যার, গেমিং, ডিজাইন, প্রকাশনা ও বিজ্ঞাপনের মতো খাত তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এটি মূল কর্মসংস্থান সংকটের সম্পূর্ণ সমাধান নয়। বড় সমাধান আসবে উৎপাদনশীল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ থেকে।
ব্যাংকিং খাত: আস্থার পুনর্গঠন
অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা হলো ব্যাংক। সেখানে অসুখ থাকলে পুরো দেহ দুর্বল হয়। বাংলাদেশে ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম এবং আমানতকারীর আস্থার সংকটে ভুগছে।
সরকার ব্যাংক রেজুলেশন আইন, আমানত সুরক্ষা আইন, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের কথা বলা হয়েছে। আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদেরও সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ সঠিক পথেই এগোচ্ছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন। ব্যাংক খাতে সংস্কার যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয় এবং পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত না হয়, তাহলে আইন কাগজে থাকবে, আস্থা ফিরবে না।
সামাজিক সুরক্ষা: মূল্যস্ফীতির ঝড়ে ছাতা
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দরকারি ছাতা। বাজেটে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড ও বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সহায়তার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির ক্ষত কতটা পূরণ করতে পারবে।
যদি খাদ্য দ্রব্যের দাম দ্রুত বাড়ে, তাহলে নগদ সহায়তা দ্রুত মূল্য হারায়। তাই সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি, কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচ কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
রাজনৈতিক অর্থনীতি: সংখ্যার পেছনের ক্ষমতার মানচিত্র
এই বাজেটকে শুধু অর্থনীতির দলিল হিসেবে দেখলে পুরো ছবি দেখা যাবে না। এটি রাজনৈতিক অর্থনীতিরও দলিল। নতুন সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে চায় এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। তাই বাজেটের আকার বড়, এডিপি বড়, বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা আছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ বরাদ্দের কথা আছে।
কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন। রাজস্ব দুর্বল হলে বড় প্রতিশ্রুতি ঋণের ওপর দাঁড়ায়। ঋণ বাড়লে সুদের ব্যয় বাড়ে। সুদের ব্যয় বাড়লে ভবিষ্যতের উন্নয়ন ব্যয় কমে। এ যেন আজকের হাততালির জন্য আগামী দিনের নিঃশ্বাস বন্ধক রাখা।
তাই এই বাজেটে রাজনৈতিক সাহস দরকার ছিল কর সংস্কারে, ভর্তুকি ব্যবস্থার স্বচ্ছতায়, অকার্যকর প্রকল্প বাছাইয়ে এবং ব্যাংক খাতের প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে।
জনগণ শুধু বাজেটের বড় অঙ্ক চায় না; তারা ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও ফল চায়।
উপসংহার: বাজেটের সাফল্য কোথায় মাপা হবে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নামানোর লক্ষ্য ৭.৫ শতাংশ, রাজস্ব লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকা, সুদের ব্যয় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
সংখ্যাগুলো বড়, কিন্তু বাস্তবতার মাটি কঠিন।
এই বাজেট সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে পাঁচটি বিষয়ের ওপর: মূল্যস্ফীতি কমে কি না, রাজস্ব আদায় বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ে কি না, ব্যাংক খাতের আস্থা ফেরে কি না, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে কি না, এবং উন্নয়ন ব্যয়ের গুণমান নিশ্চিত হয় কি না।
বাংলাদেশ এখন নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে। একদিকে সম্ভাবনার সাগর, অন্যদিকে ঘূর্ণির ভয়। বাজেট হলো জাহাজের মানচিত্র। কিন্তু মানচিত্র থাকলেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। দরকার দক্ষ ক্যাপ্টেন, মজবুত কাঠামো, সঠিক স্রোতপাঠ এবং মানুষের আস্থা।
শেষ পর্যন্ত বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে সংসদের ভাষণে নয়, বাজারের দামে; অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় নয়, কৃষকের আয়ে; বরাদ্দের অঙ্কে নয়, হাসপাতালের সেবায়; প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে নয়, তরুণ-তরুণীদের চাকরিতে।
যদি সাধারণ মানুষ একটু স্বস্তি পায়, উদ্যোক্তা একটু সাহস পায়, ব্যাংকে আস্থা ফেরে, বাজারে স্থিতি আসে, তবে এই বাজেট শুধু বড় বাজেট থাকবে না; এটি পুনরুদ্ধারের বাজেট হয়ে উঠবে। আর যদি তা না হয়, তবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল আয়োজন শুধু সংখ্যার একটি প্রাসাদ হয়েই থাকবে, নিচে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের পায়ের কাঁপুনি তাতে থামবে না।
লেখক: আশানুর রহমান
চিফ ইকোনোমিস্ট, সিটি ব্যাংক পিএলসি