চট্টগ্রামে ‘ব্রাজিল গলি’: ফুটবলের টানে এক পাড়ার রঙিন উন্মাদনা

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়। ছাদে উড়ে বিশাল পতাকা, চায়ের দোকানে চলে তর্ক-বিতর্ক, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ে সমর্থকদের সরব উপস্থিতি। তবে চট্টগ্রামের চাঁন্দগাঁওয়ের খতিবের পাড়া এলাকায় ফুটবলপ্রেমীরা সেই সমর্থনকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। নিজেদের উদ্যোগে একটি গলিকে তারা রূপ দিয়েছেন ‘ব্রাজিল গলি’তে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে খতিবের পাড়ার ব্রাজিল গলিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে সবুজ-হলুদের ছড়াছড়ি। দেয়ালজুড়ে আঁকা ব্রাজিলের পতাকা, ফুটবল আর দেশটির কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের প্রতিকৃতি। কোথাও ফুটে উঠেছে পেলে, কোথাও নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা রোনালদোর ছবি। পুরো গলিটাই যেন দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতির এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন এলাকার ব্রাজিল সমর্থক রনি সাজ্জাদ, সাজেদুল সুমনসহ একদল তরুণ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সালাউদ্দিন, কাইয়ুম উদ্দিন, সজিব ও খালেদ চৌধুরীর মতো ফুটবলপ্রেমীরাও। কয়েক দিন ধরে রং-তুলি হাতে দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা সাজিয়ে তুলেছেন পুরো গলিটি।

উদ্যোক্তাদের একজন রনি সাজ্জাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমাদের এই আয়োজন। বিশ্বকাপকে ঘিরে শুধু গলি সাজানোই নয়, মাসব্যাপী নানা কর্মসূচিরও পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। বড় পর্দায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখানো, ফুটবলভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকাকে উৎসবমুখর করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।

তবে ‘ব্রাজিল গলি’র সবচেয়ে প্রশংসিত দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব। ব্রাজিল সমর্থকদের উদ্যোগে গড়ে উঠলেও এখানে স্থান পেয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি। এমনকি পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রতিকৃতিও রয়েছে দেয়ালে। ফলে এটি কেবল ব্রাজিল সমর্থকদের নয়, সব ফুটবলপ্রেমীর জন্যই হয়ে উঠেছে এক মিলনস্থল।

এই ব্যাপারে সাজেদুল সুমন বলেন, ফুটবল হচ্ছে সবার জন্য । তবে ভালোবাসা থেকে এক এক জন এক এক দল করে। তাই বলে তো ব্রাজিলের বাইরের কোন ফ্যান আমাদের বাইরের কেউ নন। আমাদেরই প্রতিবেশি বা আমাদের পাড়ার একজন। তাই আমরা তাদের সম্মানে আর্জেন্টিনাসহ অন্য দলের খেলোয়াড়দের ছবিও এঁকেছি দেয়ালে। এতে তারাও খুশি।

এলাকার বাসিন্দারাও এ উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ রং কিনে দিয়েছেন, কেউ শ্রম দিয়েছেন, আবার কেউ বিভিন্নভাবে উৎসাহ জুগিয়েছেন। স্থানীয় এক বেকারি মালিক তরুণদের এই ফুটবলপ্রীতি দেখে তাদের জন্য বিনামূল্যে ব্রাজিলের পতাকার আদলে একটি বিশেষ কেক তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।

গলির একপ্রান্তে ভবনের ছাদ থেকে উড়ছে বিশাল আকৃতির ব্রাজিলের পতাকা। দূর থেকেই সেটি পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ এসে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে ‘ব্রাজিল গলি’ এখন শুধু একটি পাড়া নয়, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

গলি দিয়ে চলাচল করার সময় আবু সুফিয়ান নামের একজন বলেন, বিশ্বকাপের উত্তাপ যত বাড়ছে, খতিব পাড়ার ‘ব্রাজিল গলি’ও ততই জমে উঠছে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রমাণ করছে, হাজার মাইল দূরের একটি খেলা কীভাবে চট্টগ্রামের একটি গলিকেও রাঙিয়ে তুলতে পারে উৎসবের রঙে। এখানে দেয়ালের রং শুধু ব্রাজিলের নয়, ফুটবলের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসারও প্রতীক।

আয়োজকদের ভাষায়, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন আনন্দ আর উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেই বার্তাই দিতে চান তারা। তাই ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য দেশের তারকাদেরও জায়গা দেওয়া হয়েছে এই গলিতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত