দুর্দিনে ‘কংগ্রেসে’ চোখ তৃণমূলের

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০২:৫২ এএম

১০ কোটির বেশি জনসংখ্যার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনাবসানের পর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, সাংসদদের বিদ্রোহে ভাঙনের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। সবশেষ বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন পরাজয় এবং ক্ষমতাচ্যুতির পর রাজ্য ও জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়ছে দলটি। বিধানসভার পরিষদীয় দলে ভাঙন এবং সমান্তরাল গোষ্ঠী তৈরির পর, এবার দলের সংসদীয় পরিকাঠামোতেও এক বিরাট ধস নেমেছে। তবে দুর্দিনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে ভারতের এতিহ্যবাহী দল কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে তৃণমূল। গতকাল বুধবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এর ঠিক একদিন আগে গত মঙ্গলবার দিল্লির ১০ জনপথে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে কংগ্রেস নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশটির রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পর চারদিক থেকে যেভাবে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, সেই চরম দুর্দিনে জাতীয় স্তরে ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস দলকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন মমতা এবং অভিষেক। আর সেই সুদূরপ্রসারী কৌশলের অঙ্গ হিসেবেই মমতা-সোনিয়া বৈঠকের ঠিক পরের দিনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে রাহুল গান্ধীর দুয়ারে ছুটে গেলেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে তৃণমূল। পরিষদীয় দলের পর সংসদীয় দলেও ভাঙন ধরেছে। তৃণমূলের ২০ জন লোকসভার সাংসদ ‘বিদ্রোহী’ হয়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে রাহুল-অভিষেক বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, রাহুল গান্ধী এবং অভিষেকের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক চলে। দুজনের মধ্যে অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক’ হয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। লোকসভার ভেতরে ও বাইরে বর্তমান বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ কে আরও বেশি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ করার বিষয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে দলগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য ও আঞ্চলিক সংঘাত দূরে সরিয়ে রেখে, শুধুমাত্র তীব্র বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে কীভাবে সমস্ত দল এককাট্টা হয়ে ময়দানে নামতে পারে, তা নিয়েও তাদের মধ্যে গভীর আলোচনা হয়। তবে তৃণমূলের ভেতরের খবর, বৈঠকে সম্ভাব্য নতুন জোট গঠনের আলোচনার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ নিয়েও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেছেন অভিষেক।

এর আগে, গত সোমবারই দিল্লিতে আয়োজিত বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র একটি সাধারণ বৈঠকের ফাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সোনিয়া গান্ধীর মধ্যে এক নজিরবিহীন সৌজন্য সাক্ষাৎকার হয়েছিল; যেখানে দুজনকে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতে দেখা গিয়েছিল। এরপর মঙ্গলবার বিকেলে সোনিয়ার ১০ জনপথের বাসভবনে গিয়ে হাজির হন মমতা। তবে ঘটনাচক্রে, ঠিক যখন দিল্লিতে সনিয়া গান্ধীর সোফায় বসে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ঠিক সেই সময়েই সুদূর কলকাতায় সই জাল-কাণ্ডের তদন্তে মমতার কালীঘাটের বাড়িসংলগ্ন প্রধান তৃণমূল কার্যালয়ে, পুলিশ ও সিআইডি নিয়ে চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল রাজ্য প্রশাসন। কংগ্রেসে থাকাকালীন রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী ছিলেন মমতা। সেই সূত্র ধরেই সনিয়ার সঙ্গে মমতার রসায়ন বরাবরই ভালো। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল গড়লেও গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে যায়নি। জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে রাহুলের সঙ্গে মমতার মতপার্থক্য সামনে এসেছে একাধিক বার। কিন্তু সনিয়া-মমতা সম্পর্কে প্রকাশ্যে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। রাহুলকে একাধিক বার নিশানা করলেও প্রকাশ্যে সনিয়ার সমালোচনা করতে দেখা যায়নি তৃণমূল নেত্রীকে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ভরাডুবির পরে প্রকাশ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতার বার্তাও দিয়েছেন মমতা। প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙেই তৃণমূল গঠন করেছিলেন মমতা। ২৮ বছর পর সেই মমতাই দল বাঁচাতে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হলেন। সব মিলিয়ে, একদিকে ঘরের মাঠে সিআইডির তাড়া আর অন্যদিকে দিল্লিতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের মরিয়া চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতিকে কোন নতুন সমীকরণের দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত