জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধরের অভিযোগে পুলিশের এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বাসায় (চান্দগাঁও ফরিদারপাড়া) গিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। নাঈমকে মারধরের ঘটনার বিষয়ে জানতে ও দুঃখ প্রকাশ করতে সেখানে যান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
নগর পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘এ ঘটনায় ইতোমধ্যে দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই সদস্য হলেন এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাশেদ। নাঈম হাসানের কাছ থেকে আমি ঘটনার বিস্তারিত শুনেছি। বিষয়টি জানার পরপরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটিতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের আচরণ পেশাদারসুলভ ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
অভিযানে অংশ নেওয়া পুরো টিমের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা করা হবে বলে জানিয়ে সিএমপির শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শনিবার (১৩ জুন) সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশি থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশের কথিত সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের সোর্স সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে কোনো অবৈধ বস্তু পরিবহনের তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি থামানো হয়েছিল। তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে অবশ্যই পেশাদার আচরণ করতে হয়। সেই জায়গায় ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, সেটিই তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।’ পুলিশের সোর্স পরিচয়ে একজন ব্যক্তি নাঈম হাসানকে মারধর করেছেন, এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার শওকত আলী বলেন, ‘ওই ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে। পুলিশের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বেআইনি কর্মকান্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। আমি নিজেও এ ঘটনার জন্য দুঃখিত। বাংলাদেশ পুলিশ কখনোই অপেশাদার আচরণকে প্রশ্রয় দেয় না এবং কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় পুলিশ বিভাগ নেবে না।’ পুলিশি হেনস্থা ও মারধরের শিকার হওয়ার পর ক্রিকেটার নাঈম হাসান এখন তার পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাটের ফরিদার পাড়ায় রয়েছেন। শুক্রবার দিনগত সারা রাত থানায় কাটাতে হয়েছে তাকে। শনিবার ভোররাতের দিকে তিনি বাসায় ফিরেন।
শুক্রবার কী ঘটেছিল তা জানতে চাইলে ঘটনার রাতে নাঈমের সঙ্গে থানায় থাকা বড় শ্যালক আবেশ খান বলেন, ‘পুলিশের এমন আচরণে নাঈম হতবাক ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নাঈম সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তিনি প্রিমিয়ার লিগ খেলে ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রাম ফেরেন। তার অটোরিকশাটি ফ্লাইওভার থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ সংকেত দেন। তারা (পুলিশ) আমাকে পরিচয় না দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে গাড়ির ডকুমেন্ট ছিনিয়ে নেন। একপর্যায়ে তারা আমার গলা চেপে ধরে জোর করে আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করেন।’
হেনস্থার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয় নাঈমের ওপর। ‘আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন আমাকে এমন করা হচ্ছে। তখন আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। সেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য ছিলেন বলে পরে জানতে পারি। তাদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজেও আমাকে মারধর করেন’ বলেন নাঈম বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত বলে জানিয়ে নাঈম বলেন, ‘আমি আমার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। তখনও আমার গলা চেপে ধরে। আমি চিৎকার করলে আশপাশের শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। অনেকেই আমার পরিচয় জানার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন।’
নাঈম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি। তারপরও তারা আমাকে ‘আসামি’ বলে সম্বোধন করে চুপ থাকতে বলেন। আমাকে পরে পুলিশ জোর করে আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে নেওয়ার পর আমাকে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলা হয়। পরে কারো ফোন আসার পর হঠাৎ বদলে যায় পুলিশের আচরণ। এরপর তারা আমাকে বসতে বলেন।’
নাঈমের বাবা মাহবুব আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় যাই। ডিউটি অফিসার আমারে প্রথমে থানাতেই ঢুকতে দেননি। দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় ঢুকতে দেওয়া হয়। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলেছেন ওসি। পরে ঢাকা থেকে তামিম ইকবাল, ইসরাফিল খসরুর ফোন পেয়ে পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে। জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চাই।’
নাঈমের শ্যালক আবেশ জানান, পুলিশকে ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে সে আইডি কার্ডও দেখিয়েছে। সবকিছু দেখানোর পরেও সিএনজিওয়ালার কথাও পুলিশ শুনতে নারাজ। নাঈমকে গলা চিপে ধরে হচ্ছে অন্য সিএনজিতে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাঈমকে বহনকারী সিএনজিওয়ালাও শেষ পর্যন্ত থানায় ছিল। তিনিও পুলিশের হেনস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। পুলিশের সাথে সিভিল পোশাকে একজন ছিল। ওই ব্যক্তিও লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। জনগণ তাকে ধাওয়া করেছিলো।
মে মাসে সড়কে ৬২২, রেলপথে ৩৪ জন নিহত