চমেক হাসপাতাল

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া এক লাফে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি, জনমনে অসন্তোষ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বছরের ব্যবধানে এক লাফে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করায় জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেছেন, হাসপাতাল ঘিরে সক্রিয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে রোগীর মৃত্যু ও অসহায়ত্বকে পূঁজি করে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ২০০ থেকে ২৫০ গুণ আদায় করে আসছে। নতুনভাবে নির্ধারণ করা রেট না মানলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জাফর আলম নামে এক সচেতন নাগরিক বলেন, ‘বছরের ব্যবধানে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া এক লাফে ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি রোগী ও স্বজনদের পকেট কাটার জন্য ওই সিন্ডিকেটকে আরও উৎসাহিত করবে। এমনিতেই তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রোগীদের ওপর জুলুম অত্যাচার করে আসছিল।’

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) সম্মেলন কক্ষে রোগী ও মরদেহ পরিবহনের নীতিমালায় বর্ণিত বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া পুনঃমূল্যায়ন সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বেঠকে ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন, বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেল প্রতিনিধি এবং অ্যাম্বুলেন্স শ্রমিক ও মালিক সমিতির প্রতিনিধি।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন চমেক হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। এক বছর আগে চমেক হাসপাতাল থেকে নগরের দশ কিলোমিটার (আসা-যাওয়া বাবদ) দূরত্বের গন্তব্যে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৮০ টাকা। কিন্তু বছরের ব্যবধানে একই দূরত্বের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ২৬৪ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৪৪ টাকা।

চমেক হাসপাতাল থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বের গন্তব্য হলো চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা। এই উপজেলার দূরত্ব চমেক হাসপাতাল থেকে ১৩৪ কিলোমিটার (আসা-যাওয়ার হিসেবে)। এই দূরত্বে চমেক হাসপাতাল থেকে বেসরকারি এসি ও ফ্রিজার ভ্যানে রোগী ও মরদেহ পরিবহন ভাড়া ছিল ৪৪৫০ টাকা। এখন একই গন্তব্যে ১৩০৮ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫৭৮৫ টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে সরকারি কোন নীতিমালার আলোকে এক লাফে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলো? এমন প্রশ্নের উত্তরে চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বুধবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি সেভাবে দেখা উচিত নয়। গত বছর জুনে আমরা ১০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে ছিলাম। জ্বালানি তেলের দাম বাড়াসহ নানা কারণে এবার ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছি। তবে হাসপাতাল ঘিরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট কোনো নিয়মই তো মানেনি। তারা রোগীর মৃত্যু ও অসহায়ত্বকে পূঁজি করে ২০০ থেকে ২৫০ গুণ ভাড়া আদায় করেছে।’

এদিকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে গত ৭ জুন বাগবিতণ্ডার জেরে শ্রমিক ও মালিক সমিতির লোকজন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার দুই নেতার ওপর হামলা চালায়। চমেক হাসপাতালের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার প্রতিবাদে গেল রবিবার সংগঠনটি চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সদস্যসচিব এম এ আলী আশিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক সাহাদাত হোসেন আহত হয়েছেন বলে দাবি করে সংগঠনটি।

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নৈরাজ্য নিয়ে এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ করছে। বাইরের অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে না। রোগী ও স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।’

এনসিপির দাবি, নোয়াখালী যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে ১২ হাজার টাকা ভাড়া চাওয়া হয়, যেখানে স্বাভাবিক ভাড়া প্রায় ৫ হাজার টাকা। একইভাবে এর আগে ফেনীর জন্য ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকার পরিবর্তে ৯ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত বলেন, ‘চমেক হাসপাতাল থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য আর বরদাশত করা হবে না। নতুন করে নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে দেওয়া হবে এবং কোনো অ্যাম্বুলেন্স চালক নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে ফেরত দিতে বাধ্য করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে চমেক হাসপাতাল ঘিরে সক্রিয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) এজিএম মনিরুল হাসান সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত সোমবার তিনি এ নির্দেশনা দেন। তার জারি করা এক প্রশাসনিক আদেশে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) ঘটনাটি সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

জানা গেছে, সরকারি ৪টি ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির অধীনে ১২০টি এসি ও নন এসি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর বাইরে আছে আরও ১৫০ অ্যাম্বুলেন্স, যেগুলো সমিতির অন্তর্ভুক্ত নয়। চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ইউসুফ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সেবা মানুষের জীবন রক্ষা ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পূর্বের ভাড়ায় রোগী বা মরদেহ পরিবহন সম্ভব হচ্ছিল না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত