লিজা ও আকাশ ২০১৪ সালে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন। উল্লিখিত নামগুলো তাদের ছদ্মনাম। দুজনেরই সেটি দ্বিতীয় বিয়ে; প্রথম ঘরে তাদের সন্তান ছিল। বছর না ঘুরতেই শুরু হয় তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন, ক্রমে তিক্ততা বাড়ে। ইতিমধ্যে তাদের দাম্পত্যের ইতি ঘটেছে। একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়েছিল। লিজার অভিযোগ, আকাশ যৌতুকের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন বিয়ের পর থেকেই। নিজের স্বর্ণালংকার বিক্রি করে এবং নগদ অর্থ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি লিজার। নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকে। বিষয়টি আইনি লড়াইয়ের রূপ নেয়। প্রথমে লিজা যৌতুক আইনে একটি মামলা করেন আকাশের বিরুদ্ধে; পরে ভরণপোষণ, দেনমোহর চেয়ে পারিবারিক আদালত-৫-এ আরেকটি মামলা করেন। ওই মামলায় রায় ও ডিক্রি পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকা পাননি লিজা। ডিক্রি-মোকদ্দমা চলমান রয়েছে ঢাকার পারিবারিক আদালত-৮-এ। ১১ বছর পার হলেও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। লিজার অভিযোগ, তাকে হয়রান করতে দেশের বিভিন্ন জেলায় মিথ্যা মামলা করেছেন আকাশ।
শুধু এ মামলাই নয়, ঢাকার ১৪টি পারিবারিক আদালতে ১১ হাজার ৯৩৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একেকটি আদালতে গড়ে ৮৫২টি মামলা বিচারাধীন। এসব আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত এবং মুসলিম পারিবারিক আইনের অধীনে উদ্ভুত অন্যান্য বিরোধের নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।
বেশ কয়েকটি আদালত ঘুরে দেখা গেছে, এজলাসগুলো হাজার হাজার নথিতে ঠাসা। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মাত্র তিনটি পারিবারিক আদালত ছিল। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আদালত বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
পারিবারিক আদালতে মামলা বাড়ার বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফারহানা জামান বলেন, ‘আগে বিবাহবিচ্ছেদকে সামাজিক কলঙ্ক ও অমর্যাদাকর বিষয় হিসেবে দেখা হতো; এখন ততটা নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। নারীদের শিক্ষা ও তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন নিজের ইচ্ছাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আপস করার মানসিকতা কমে গেছে। এতে পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব কমছে।’
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘মানুষ একে-অপরকে সম্মান করতে চাইছে না।’ তিনি বলেন, ‘পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পারিবারিক আদালত-১-এ এক হাজার ২৭টি, আদালত-২-এ এক হাজার ৭৮৩টি, আদালত-৩-এ এক হাজার ১৮টি, আদালত-৪-এ ২৯১টি, আদালত-৫-এ ৫১টি, আদালত-৬-এ ২ হাজার ৮৭০টি, আদালত-৭-এ ৯৯৬টি, আদালত-৮-এ এক হাজার ১০৪টি, আদালত-৯-এ ৩৯২টি, আদালত-১০-এ ৭৬৭টি, আদালত-১১-এ ৬২৯টি, আদালত-১২-এ ১৫২টি, আদালত-১৩-এ এক হাজার ৮৭টি এবং আদালত-১৪-এ ৫৯৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পারিবারিক বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য পাঁচটি আপিল আদালতও রয়েছে। বিচারকরা ছুটিতে থাকায় বা পদ শূন্য থাকার কারণে প্রায়ই মামলা বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে বিবাদীরা বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করতে বারবার সময়ের আবেদন করেন, যা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়। একটি মামলা শেষ করতে জীবন থেকে হারিয়ে যায় এক-দুই দশক। সময় বেশি লাগে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলাগুলোতে। বিবাদী পক্ষ উচ্চ আদালতের দোহাই দিয়ে সময় ক্ষেপণ করে। মামলার দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য উভয়পক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম শুরুর আগে পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে বিপাকে শিশু : ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রোজিনা বানু ১৮ বছর আগে পারিবারিকভাবে সেলিম পারভেজের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির আট ও এগারো বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে। দাম্পত্য কলহের জেরে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সন্তানদের হেফাজত বা কার কাছে থাকবে তা নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের শিকার হয় সন্তানরা।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০০৮ সালে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর রোজিনা জানতে পারেন তার স্বামী মাদকাসক্ত ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত। এ ছাড়া যৌতুকের দাবিতে তাকে প্রায়ই মারধর করা হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ২০১৮ সালে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালে তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। আদালতে রোজিনা অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি তার দুই ছেলের হেফাজত চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। অন্যদিকে বাবাও সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে আবেদন করেন। সন্তানদের একাধিকবার আদালতে হাজির করা হয়। তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা বাবা ও মা দুজনকেই চায়।
নারী ও শিশু অধিকারকর্মীরা মনে করেন, বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে শিশুদের প্রতি এমন আচরণ পিতা-মাতা পরিচয়ের এক ধরনের অপব্যবহার এবং শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। ‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক বলেন, ‘পরিবার একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র পারিবারিক ব্যবস্থাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মা উভয়েই দায়ী।’
নারী অধিকারকর্মী এবং ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ‘অনেক পুরুষ দায়িত্ব না নিয়ে একতরফাভাবে স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে চলে যান।’ তিনি বলেন, ‘মতাদর্শগত পার্থক্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রায়ই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত সমাজে দম্পতিদের জন্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের এখানে তেমন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করতে পারলে সুফল মিলতে পারে।’