আটলান্টার আকাশছোঁয়া স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন নীল আর লালে সয়লাব। একদিকে বর্তমান ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন, আর অন্যদিকে বিশ্বকাপের নবীনতম সদস্য পুঁচকে কেপ ভার্দে। কেউ ভাবেনি মহাতারকাদের বিপক্ষে এক পয়েন্টও ছিনিয়ে নিতে পারবে দ্বীপরাষ্ট্রের এই দেশটি। কিন্তু ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা যখন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন, তখন ইয়ামাল বা পেদ্রিদের সব আক্রমণই যেন বৃথা গেল। স্পেনের মতো পরাশক্তিকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দের এই রূপকথা ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই মাঠ কেবল শক্তির নয়, বিশ্বাসের লড়াইয়েরও জায়গা।
কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য শুরুর রেশ ধরে ব্রিটিশ ম্যাগাজিন ফোরফোরটু এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অবিশ্বাস্য ২৬টি অঘটনের তালিকা। সেই রোমাঞ্চকর সংকলনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
২৬. স্পেন ০-০ কেপ ভার্দে (২০২৬)
চলতি আসরের সবচেয়ে বড় চমক এটি। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষুদ্রতম দেশ কেপ ভার্দে। নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই তারা রুখে দিয়েছে বিশ্বসেরা স্পেনকে। গোলরক্ষক ভোজিনহার অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এই ম্যাচকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে দিয়েছে।
২৫. যুক্তরাষ্ট্র ১-২ ইরান (১৯৯৮)
ফ্রান্সের মাঠে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। হামিদ এস্তিলি ও মেহদি মাহদাভিকিয়ার গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয় তুলে নিয়েছিল ইরান।
২৪. ব্রাজিল ১-২ নরওয়ে (১৯৯৮)
রোনালদো-রিভালদোদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ব্রাজিলকে গ্রুপ পর্বে স্তব্ধ করে দিয়েছিল নরওয়ে। তোরে আন্দ্রে ফ্লোর গোল এবং ক্রিস্টিল রেকডালের পেনাল্টিতে জয় পায় তারা। রেকর্ড বলছে, নরওয়েই একমাত্র দল যারা ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলে কখনো হারেনি।
২৩. কোস্টারিকা ১-০ স্কটল্যান্ড (১৯৯০)
টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা অভিজ্ঞ স্কটল্যান্ডকে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচেই হারিয়ে দেয় নবাগত কোস্টারিকা। হুয়ান কায়াসোর একমাত্র গোলে জয় পায় ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটি।
২২. ফ্রান্স ১-২ দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০)
অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর চরম বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত ফরাসিদের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হারিয়ে বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বজয়ী দলটির এমন পতন ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছিল।
২১. দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ জার্মানি (২০১৮)
নকআউট পর্বে যাওয়ার জন্য জার্মানির শুধু জয় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যোগ করা সময়ে সন হিউং-মিনের অবিশ্বাস্য গোলসহ ২ গোল হজম করে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
২০. স্পেন ০-১ সুইজারল্যান্ড (২০১০)
ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফেবারিট ছিল স্পেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে তারা বড় ধাক্কা খায়। যদিও এই হারের পর সব ম্যাচ জিতে সেবার স্পেনই শিরোপা জিতেছিল।
১৯. স্কটল্যান্ড ৩-২ নেদারল্যান্ডস (১৯৭৮)
টানা দুইবারের ফাইনালিস্ট ডাচদের বিপক্ষে আর্চি জেমিলের জাদুকরী গোলসহ ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল স্কটল্যান্ড। যদিও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় স্কটল্যান্ডের পরের রাউন্ডে যাওয়া হয়নি।
১৮. রোমানিয়া ৩-২ আর্জেন্টিনা (১৯৯৪)
ম্যারাডোনা ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে বিদায় করে দেয় রোমানিয়া। জর্জ হাগির জাদুকরী পারফরম্যান্স এই জয়কে স্মরণীয় করে রেখেছে।
১৭. ইতালি ০-১ আয়ারল্যান্ড (১৯৯৪)
নিউ জার্সির মাঠে ৭৫ হাজার দর্শকের সামনে রে হফটনের দূরপাল্লার শটে গোল করার পর আয়ারল্যান্ডের ডিফেন্স আর ভাঙতে পারেনি রবার্তো ব্যাজিওর ইতালি।
১৬. মরক্কো ১-০ পর্তুগাল (২০২২)
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় করে দিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়ে মরক্কো। ম্যাচ শেষে রোনালদোর কান্নার ছবি আজও ভক্তদের মনে গেঁথে আছে।
১৫. স্লোভাকিয়া ৩-২ ইতালি (২০১০)
২০০৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় স্লোভাকিয়া। পুরো টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচও জিততে না পারা ইতালির জন্য এটি ছিল বড় লজ্জা।
১৪. বুলগেরিয়া ২-১ জার্মানি (১৯৯৪)
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে স্তব্ধ করে দেয় বুলগেরিয়া। স্টোইচকভ ও লেচকভের তিন মিনিটের ব্যবধানের দুই গোলে সেমিফাইনালে যায় তারা।
১৩. উরুগুয়ে ২-১ ব্রাজিল (১৯৫০)
মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ দর্শকের সামনে ড্র করলেই শিরোপা জিততো ব্রাজিল। কিন্তু উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় স্বাগতিকরা। এই ট্র্যাজেডি ফুটবল ইতিহাসে 'মারাকানাজো' নামে পরিচিত।
১২. স্পেন ১-৫ নেদারল্যান্ডস (২০১৪)
তখনকার বিশ্বজয়ী স্পেনের সোনালী প্রজন্মকে ব্রাজিলের মাটিতে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল নেদারল্যান্ডস। রবিন ভ্যান পার্সির সেই বিখ্যাত 'ফ্লাইং ডাচম্যান' হেড ছিল এই ম্যাচের সেরা প্রাপ্তি।
১১. দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ ইতালি (২০০২)
টট্টি, দেল পিয়েরোদের ইতালিকে গোল্ডেন গোলের নাটকে নকআউট করে দেয় কো-হোস্ট দক্ষিণ কোরিয়া। ইতালিয়ান ক্লাবে খেলা আন জং-হোয়ানের হেডে জয় পায় কোরিয়া।
১০. পশ্চিম জার্মানি ১-২ আলজেরিয়া (১৯৮২)
নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপেই শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে আলজেরিয়া। ইউরোপের কোনো দলকে হারানো প্রথম আফ্রিকান বা আরব দেশ ছিল তারা।
৯. স্পেন ০-১ উত্তর আয়ারল্যান্ড (১৯৮২)
স্বাগতিক স্পেনের ঘরের মাঠে তাদেরই ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে গিয়েছিল উত্তর আয়ারল্যান্ড। গেরি আর্মস্ট্রং করেছিলেন জয়সূচক গোলটি।
৮. পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
হাঙ্গেরির সেই বিখ্যাত 'ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স' দলটিকে ফাইনালে হারিয়ে দেয় পশ্চিম জার্মানি, যা ইতিহাসে 'মিরাকল অব বার্ন' নামে পরিচিত।
৭. আর্জেন্টিনা ১-২ সৌদি আরব (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে মহাকাব্য লেখে সৌদি আরব। সালেম আল দাওসারির সেই গোল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন।
৬. ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২)
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ও জিদানহীন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় নবাগত সেনেগাল। পাপা বুবা দিওপ করেছিলেন ঐতিহাসিক সেই গোলটি।
৫. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১-০ ইংল্যান্ড (১৯৫০)
ফুটবলের জনক দাবি করা ইংল্যান্ডের শক্তিশালী দলটিকে ব্রাজিলের মাটিতে ১-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল আমেরিকার পার্ট-টাইম ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলটি।
৪. পূর্ব জার্মানি ১-০ পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪)
বার্লিন প্রাচীর থাকার সময়ে চরম রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যে ঘরের মাঠে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দিয়েছিল তাদেরই প্রতিবেশী পূর্ব জার্মানি।
৩. আর্জেন্টিনা ০-১ ক্যামেরুন (১৯৯০)
ম্যারাডোনার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে উদ্বোধনী ম্যাচে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ক্যামেরুন। ৯ জনের দল নিয়ে ক্যামেরুনের এই জয় আজও রূপকথা হয়ে আছে।
২. উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি (১৯৬৬)
ইংল্যান্ডের মাঠে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে উত্তর কোরিয়া। পাক দু-ইকের সেই গোল ইতালিয়ান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় কালো অধ্যায়।
১. ব্রাজিল ১-৭ জার্মানি (২০১৪)
'ফোরফোরটু'-র মতে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন। ঘরের মাঠে সেমিফাইনালের মঞ্চে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ১-৭ গোলের এই আত্মসমর্পণ 'মিনেইরাজো' নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।