চট্টগ্রাম

আয়াতের স্মরণে আদালতে আর্জেন্টিনার জার্সি

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

আদালতকক্ষে তখন বহুল আলোচিত আলিনা ইসলাম আয়াত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা চলছে। বিচারক যখন প্রধান আসামি আবীর আলীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন, তখন স্বস্তি আর কান্না একসঙ্গে ভর করে উপস্থিত স্বজন, প্রতিবেশীদের মুখে। 

তবে বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দৃশ্য ছিল একদল শিশু ও কিশোরকে ঘিরে। তাদের প্রায় সবার গায়ে নীল-সাদা আর্জেন্টিনার জার্সি।

বয়স ৯ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। তারা আয়াতের সমবয়সী বন্ধু, খেলার সাথী, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সন্তান। যেন তারা সবাই মিলে খুঁজছিল অনুপস্থিত ছোট্ট আয়াতকে।

কেন আর্জেন্টিনার জার্সি? এই প্রশ্নের উত্তরেই উঠে আসে পাঁচ বছর বয়সী আয়াতের এক অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প।

২০২২ সালের নভেম্বরে কাতার বিশ্বকাপ শুরুর উন্মাদনা চলছিল। সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও তখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত মানুষ। সেই উন্মাদনার ছোঁয়া লেগেছিল ছোট্ট আয়াতের মনেও। খেলার নিয়ম পুরোপুরি না বুঝলেও আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে ছিল তার আলাদা আগ্রহ। বিশ্বকাপের খেলা দেখবে বলে বাবার কাছে একটি আর্জেন্টিনার জার্সি বায়না করেছিল সে। মেয়ের আবদার রাখতে জার্সি কিনে দিয়েছিলেন বাবা সোহেল রানা। নতুন জার্সি পরে বল হাতে, বল পায়ে নানা ভঙ্গিতে ছবিও তুলেছিল আয়াত। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আয়াতের বাবা সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকে ওর সমবয়সী ফারাজ, সুমাইয়াকে দেখে বারবার মনে হচ্ছে আমার মেয়েটাও যদি বেঁচে থাকত, তাহলে ওদের সঙ্গে বিশ্বকাপ খেলা দেখত। গতকালও আর্জেন্টিনার খেলা ছিল। ও থাকলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সঙ্গে খেলা দেখত। ও খেলা খুব একটা বুঝত না, কিন্তু খেলা দেখতে খুব পছন্দ করত। আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য আবদার করেছিল। আমি কিনেও দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন টিকল না।’

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘একটা সন্তান হারানোর কষ্ট কোনো বাবা-মায়ের পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আদালত রায় দিয়েছেন, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আময়ার দ্রুত এ রায়ের কার্যকর দেখতে চাই। 

আয়াতের মা তামান্না বলেন, ‘আমার আয়াত প্রথমে আমার কাছেই জার্সির আবদার করেছিল। পরে আমি তার বাবাকে বলি। জার্সি এনে দেওয়ার পর সে কত খুশি হয়েছিল! জার্সি পরে বল হাতে, বল পায়ে কত রকম ছবি তুলেছিল। বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। সেই ছবিগুলো এখনও আমাদের মোবাইলে আছে। মাঝে মাঝে দেখি আর কান্নায় ভেঙ্গে পরি।’

তিনি বলেন, ‘একটা বিশ্বকাপ শেষ হয়ে আরেকটা বিশ্বকাপ চলে এসেছে। কিন্তু আমার মেয়েটা আর নেই। অন্য বাচ্চারা বড় হচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, খেলাধুলা করছে, এবারের বিশ্বকাপ দেখতে। আমার মেয়ের বয়সও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু সে পাঁচ বছর বয়সেই থেমে গেছে।’

আদালতে উপস্থিত আয়াতের চাচাতো ভাই আনাস বলেন, আমার বোনটা খুব হাসিখুশি মেয়ে ছিল। সবাইকে নিয়ে খেলতে পছন্দ করত। পুরো পরিবারে সে ছিল সবার আদরের। কাতার বিশ্বকাপ শুরুর সময় সে খুব আনন্দে ছিল। আর্জেন্টিনার খেলা দেখবে বলে জার্সি নিয়েছিল। জার্সি পরে এসে আমাদের দেখিয়ে বলেছিল, ‘দেখো, আমি আর্জেন্টিনা।’ তখন তার মুখের হাসিটা এখনও চোখে ভাসে।

তিনি আরও বলেন, ‘তার হত্যার চারদিন পরই আর্জেন্টিনার ম্যাচ ছিল। আমরা তখন শোকে পাথর হয়ে ছিলাম। খেলা দেখার কথা ভাবতেও পারিনি। আজকে তার স্মরণে আমরা কাজিনরা, তার সমবয়সী বন্ধুরা সবাই আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আদালতে এসেছি। যেন সবাই জানে, আয়াত শুধু একটি চাঞ্চল্যকর মামলার নাম নয়; সে ছিল স্বপ্নভরা একটি শিশু।’

প্রতিবেশী সুফিয়ানা বলেন, ‘আজকে যারা আর্জেন্টিনার জার্সি পরে এসেছে, তাদের অনেকেই আয়াতের সঙ্গে খেলাধুলা করত। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, আয়াতও যেন তাদের মাঝখানে কোথাও আছে। আমরা তাকে ভুলিনি, কোনোদিন ভুলবও না।’

রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন স্বজনরা। কেউ আয়াতের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরেন, কেউ নীরবে চোখ মুছেন, কেউ কেউ ক্ষোভ জানিয়ে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান। 

২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর নগরের ইপিজেড থানার নয়ারহাট ওয়াছ মুন্সী বাড়ি এলাকায় আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছর বয়সী আলিনা ইসলাম আয়াত। পরে পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে আসে দেশের অন্যতম আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণের পর প্রতিবেশী আবীর আলী তাকে হত্যা করে। পরে লাশ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ঘটনার ১৬ দিন পর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় আয়াতের দেহাবশেষ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত