বন্ধ ৩৪.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র

গ্যাসের জেলা ভোলায় বিদ্যুৎ সংকট: বিকল ট্রান্সফরমারে বাড়ছে দুর্ভোগ

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

গ্যাস উত্তোলন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ভোলা। জেলার গ্যাস ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মেটালেও স্থানীয় পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোলার বাসিন্দারা।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দুই বছর ধরে বিকল গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমার, আর প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে আছে গ্রিড সাবস্টেশন প্রকল্প। ফলে গ্যাসসমৃদ্ধ এই জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভোলা সদর উপজেলার খেয়াঘাটসংলগ্ন বিশ্বরোড এলাকায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০০৯ সালের ১২ জুলাই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস দিয়ে পরিচালিত কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ভোলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম ভরসা ছিল। ইউনিটপ্রতি মাত্র ২ টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা থাকলেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যান্ত্রিক ত্রুটিতে কেন্দ্রটির টারবাইন বিকল হয়ে যায়।

এরপর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, নবায়ন জটিলতা এবং পুনরায় চালু করতে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তার কারণে কেন্দ্রটি আর সচল হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

এদিকে, বোরহানউদ্দিনে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দুটি ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে একটি ট্রান্সফরমারের ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা হলেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘনঘন বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। ভোলা শহর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিকল ট্রান্সফরমারটি বিশেষ ধরনের হওয়ায় দেশে এর বিকল্প নেই। নতুন ট্রান্সফরমার তৈরি ও স্থাপনে দুই থেকে আড়াই বছর সময় এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে সমস্যাটির দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা এলাকায় গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। কয়েক বছর আগে জমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। পরবর্তীতে নতুন বরাদ্দের সুপারিশ করা হলেও তা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিপরীতে চরফ্যাশন গ্রিড সাবস্টেশনের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

জানা গেছে, ভোলায় প্রায় ১ হাজার ৪৩৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে। এই গ্যাস ব্যবহার করে প্রায় সাড়ে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলেও জেলার চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হলেও স্থানীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোলার মানুষ।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সঞ্চালন লাইনের পাশে অপরিকল্পিতভাবে লাগানো গাছও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেই গাছ ভেঙে লাইনের ওপর পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন হওয়ায় এসব ত্রুটি দ্রুত সমাধান করতেও বেগ পেতে হয়।

৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের শিফট ইনচার্জ (অপারেশন) জাকির হোসেন সবুজ বলেন, 'টারবাইন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে। নতুন করে চালু করতে কয়েকশ কোটি টাকার প্রয়োজন। তাই কোম্পানির পক্ষ থেকেও আগ্রহ কম।'

ওজোপাডিকোর ভোলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ বলেন, 'ভোলার বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বন্ধ ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু, গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণ এবং সঞ্চালন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিকল্প নেই।'

ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, 'গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা হওয়ার পরও ভোলাবাসী বিদ্যুৎ সংকটে থাকবে, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারকে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু এবং গ্রিড সাবস্টেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।'

জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, 'বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু এবং গ্রিড সাবস্টেশন বাস্তবায়নের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সমস্যাগুলো সমাধানে আমরা কাজ করছি।'

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভোলার মাটি থেকে উত্তোলিত গ্যাসে জাতীয় গ্রিড শক্তি পেলেও স্থানীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে সেই সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছে না জেলার মানুষ। তাদের দাবি, বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু, নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন এবং ভোলা গ্রিড সাবস্টেশন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে জেলার বিদ্যুৎ সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।



×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত