১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোল । ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক এই ম্যাচে ম্যারাডোনার গায়ে থাকা চকচকে নীল জার্সিটি ২০২২ সালে নিলামে বিক্রি হয় রেকর্ড ৯.২৮ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১০০ কোটি টাকা)। কিন্তু কোটি কোটি টাকার এই জার্সির শুরুর গল্পটা রাজকীয় কোনো শোরুমের নয়; বরং মেক্সিকো সিটির কুখ্যাত এক পাইরেটেড বা সস্তা কাপড়ের বাজার ‘তেপিতো’ -র!
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাঝেই ম্যারাডোনার সেই জার্সি তৈরির অবিশ্বাস্য নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ নির্মাতা ফিদেল ম্যাককেব তৈরি করেছেন একটি তথ্যচিত্র—এল দিয়েজ: মেড ইন তেপিতো।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে নীল রঙের জার্সি পরে খেলেছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে নিয়ম অনুযায়ী উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের সাথে জার্সি বিনিময় করেন ম্যারাডোনারা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনাকে নীল জার্সি পরে মাঠে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু হাতে মাত্র দুদিন সময়, তার ওপর মেক্সিকোর তীব্র গরমে পরার মতো উপযুক্ত কোনো হালকা নীল জার্সি আর্জেন্টিনা দলের কিট ব্যাগে ছিল না।
জরুরি এই সংকটের মুখে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন আর্জেন্টিনা দলের তৎকালীন ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হেক্টর মিগুয়েল জেলাদা। তিনি মেক্সিকোর ক্লাব ‘আমেরিকা’-তে খেলার সুবাদে মেক্সিকো সিটি খুব ভালো চিনতেন। তিনি পরামর্শ দেন স্থানীয় সস্তা কাপড়ের বাজার ‘তেপিতো’ থেকে জার্সি জোগাড় করার, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো ব্র্যান্ডের হুবহু নকল বা ‘পাইরেট’ জিনিস পাওয়া যায়।
মাত্র দুই দিনের নোটিশে তেপিতোর বাজার থেকে সাধারণ কিছু নীল রঙের জার্সি কিনে আনা হয়। এরপর শুরু হয় সেগুলোকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে রূপান্তরের এক অদ্ভুত কর্মযজ্ঞ:
-
হাতে সেলাই করা লোগো: আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের লোগো বা ব্যাজগুলো খেলোয়াড় ও স্টাফরা নিজেরাই জার্সিতে হাতে সেলাই করে বসিয়ে নেন।
-
আমেরিকান ফুটবলের নম্বর: জার্সির পেছনে বসানোর মতো সাধারণ ফুটবলের নম্বর না পেয়ে, আমেরিকান ফুটবলের চকচকে রুপালি রঙের নম্বর ইস্ত্রি করে ম্যারাডোনাদের জার্সিতে বসিয়ে দেওয়া হয়।
নির্মাতা ম্যাককেবের ভাষায়, "পুরো বিষয়টি এমন অপেশাদার এবং রোমাঞ্চকর উপায়ে করা হয়েছিল, যা কেবল আশির দশকের ফুটবল দুনিয়াতেই সম্ভব ছিল।"
এই তথ্যচিত্রটি শুধু ম্যারাডোনার শ্রেষ্ঠত্বের গল্প বলে না; বরং এটি স্পটলাইটে নিয়ে আসে মেক্সিকোর সেই সাধারণ খেটে খাওয়া দর্জি এবং বিক্রেতাদের, যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে চেনা ছবিগুলোর একটি তৈরি হয়েছিল।
মেক্সিকো সিটির মানুষের মনেও এই ঘটনা নিয়ে অনেক সংশয় ছিল। কিন্তু নির্মাতা ম্যাককেব তেপিতোর বাজারে ঘুরে মানুষের সাথে কথা বলে এবং সাবেক খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই সত্যটি উদঘাটন করেছেন। তিনি বলেন, "বর্তমান যুগে মানুষ ফুটবল থেকে একধরণের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। সাধারণ মানুষের মনে হয় বিশ্বকাপ যেন এখন আর তাদের জন্য নয়। তাই এই গল্পের মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসে মেক্সিকোর এবং তেপিতোর সাধারণ মানুষের অবদানকে উদযাপন করা ভীষণ জরুরি ছিল।"
আগামী ২০৩০ সালে এই ঐতিহাসিক ম্যাচের ৪০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই উপলক্ষকে সামনে রেখে ওয়াম্বোকার ওহাপার নামের এক স্থানীয় ওআহাকান আদিবাসী শিল্পী মেক্সিকো সিটির ‘রিপাবলিক অব আর্জেন্টিনা’ সড়কে একটি বিশালাকার দেয়ালচিত্র বা ম্যুরাল এঁকেছেন।
শিল্পী ওহাপা বলেন, "একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একটি জাতীয় দল তথাকথিত 'পাইরেট' বা নকল জার্সি পরে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল জিতে গেল—এই বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। আমি এই দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে আমাদের তেপিতো পাড়ার সাধারণ ব্যবসায়ী এবং মেক্সিকানদের কঠোর পরিশ্রমকে তুলে ধরতে চেয়েছি। ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফিফা নয়; এর পেছনে আমাদের মতো স্থানীয় বাণিজ্যের এবং মেক্সিকানদের শ্রমও জড়িয়ে আছে।"
শতাব্দীর সেরা সেই দুই গোলের সাক্ষী হয়ে আজো টিকে আছে তেপিতোর বাজার। কোটি ডলারে বিক্রি হওয়া ম্যারাডোনার সেই নীল জার্সি আজো মনে করিয়ে দেয়—ফুটবলের চিরকালীন সৌন্দর্য কখনো কোনো দামি ব্র্যান্ডের ফ্যাব্রিকে আটকে থাকে না, তা তৈরি হতে পারে মেক্সিকোর কোনো এক ধুলোবালি মাখা সস্তা বাজারের গলিতেও।