এমএসএমই খাত দেশের অর্থনীতির শিকড়

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:২১ এএম

দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লা খান। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদিএকটি বিশাল বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সিএমএসএমই খাত হলো তার শিকড়। এই খাতই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-কে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ১০ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের প্রায় ২২ শতাংশ। আগামী দিনে এ হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ব্যাংকটি।

তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম।

দেশ রূপান্তর : দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মো. রাফাত উল্লা খান : দেশের অর্থনীতির ভেতরের শক্তিকে ধারণ করে সিএমএসএমই খাত। কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এ খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসাভিত্তিক এমন অসংখ্য উদ্যোগ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। একইসঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করছে এই খাত। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে সিএমএসএমই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশ রূপান্তর : কেন সিএমএসএমই খাতকে উদ্যোক্তা তৈরির সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম বলা হয়?

মো. রাফাত উল্লা খান : প্রায় সব বড় ব্যবসার শুরুই ছোট উদ্যোগ থেকে। সিএমএসএমই খাত একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসার বাস্তব শিক্ষা দেয়। এখানে তিনি বাজার বুঝতে, ঝুঁকি নিতে, সীমিত সম্পদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখেন। তুলনামূলক কম পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ থাকায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম।

দেশ রূপান্তর : নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মো. রাফাত উল্লা খান : বর্তমানে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক এখন উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন অংশীদার। অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যবসা পরিকল্পনা, আর্থিক শৃঙ্খলা, উপযুক্ত অর্থায়ন কাঠামো এবং ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংকের ভূমিকা রয়েছে। আমরা চাই উদ্যোক্তারা ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী হিসেবে দেখুক।

দেশ রূপান্তর : আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কেন সিএমএসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?

মো. রাফাত উল্লা খান : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন হলো উৎপাদনমুখী অর্থায়ন, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। সিএমএসএমই খাত এই দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা এবং এর আওতায় ৯ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা সেবা গ্রহণ করছেন। এটি দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

দেশ রূপান্তর : এ খাতে ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মো. রাফাত উল্লা খান : বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ২২ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে এ হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, গ্রামীণ ব্যবসা এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দেশ রূপান্তর : নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের বিশেষ আর্থিক পণ্য রয়েছে?

মো. রাফাত উল্লা খান : উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। ‘তিজারা’ সাধারণ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন বিনিয়োগ সুবিধা দেয়। ‘নিসা’ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘আত-তাওফিক’ ও ‘আল-আওয়ানা’ জামানতের বিপরীতে বৃহত্তর বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে। পাশাপাশি ট্রেড ফাইন্যান্স, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাও দেওয়া হচ্ছে।

 দেশ রূপান্তর : জামানতসংকট দূর করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

মো. রাফাত উল্লা খান : জামানতের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। এ সমস্যা সমাধানে আমরা ‘তিজারা’ ও ‘নিসা’ নামে জামানতবিহীন বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্ভাবনা, নগদ প্রবাহ, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাও কাজে লাগানো হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ব্যাংকের ভূমিকা কী?

মো. রাফাত উল্লা খান : বর্তমানে আমাদের নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং প্রায় ৯০০ নারী উদ্যোক্তা এর আওতায় রয়েছেন। নারীদের জন্য ‘নিসা’ ও ‘আল-আওয়ানা’ নামে বিশেষায়িত বিনিয়োগ পণ্য চালু করা হয়েছে। এখন নারী উদ্যোক্তারা প্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন ও সেবা খাতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন।

দেশ রূপান্তর : তরুণ উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে?

মো. রাফাত উল্লা খান : শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত এসআইসিআইপি কর্মসূচির আওতায় উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা, বিপণন কৌশল এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দেশ রূপান্তর : এসআইসিআইপি কর্মসূচি উদ্যোক্তাদের কীভাবে উপকৃত করছে?

মো. রাফাত উল্লা খান : বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে শুধু মূলধন থাকলেই সফল হওয়া যায় না। প্রয়োজন দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবসায়িক জ্ঞান। এসআইসিআইপি কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যোক্তারা বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, যা তাদের ব্যবসা পরিচালনা, বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করছে।

দেশ রূপান্তর : আল-আরাফাহ্ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী ভূমিকা রাখছে?

মো. রাফাত উল্লা খান.: এআরডিপি আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন এবং বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মকা-ে অর্থায়ন করা হয়। অনেক প্রান্তিক মানুষ এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসছেন। আমরা এআরডিপি-কে শুধু অর্থায়ন কর্মসূচি নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা অর্জনের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত