হরমুজ নিয়ন্ত্রণে ইরান-ওমান বৈঠক

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৭:০৩ এএম

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নতুন সংঘাতের ফলে স্থায়ী শান্তিচুক্তির ভবিষৎ নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখন প্রশমনের পথে। দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধে রাজি হওয়ায় আবারও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ প্রশস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অন্যতম শর্ত হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। সে লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের সুষ্ঠু ভবিষৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরানের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে ‘সার্ভিসেস ফি’ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালিতে কোনো ধরনের ফি বা টোল ছিল না। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন মাসকাট সফরকালে যৌথ হরমুজ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে প্রণালি-সংক্রান্ত বর্তমান বিষয়গুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও মতবিনিময় করেছি। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নীতি অনুযায়ী, উভয় দেশের কেউই এই পথ বন্ধ বা চলাচলের জন্য টোল আদায় করতে পারে না।

হরমুজ প্রণালির সীমান্তবর্তী দুই দেশ ওমান ও ইরান। এ পথেই বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও রপ্তানি করা হয়। অন্তত, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত দেখা দেওয়ার আগে বিষয়টি এমনই ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা শুরু করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় থেকে আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা পেতে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখে তেহরান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে মাত্র ৩০ কিলোমিটার প্রস্থের সংকীর্ণ এই জলপথকে অনেকটা অস্ত্রের মতোই ব্যবহার করেছে তেহরান। গত মঙ্গলবার তেহরানের কর্মকর্তাদের মাসকাট সফরের পর ওমান ও ইরান যৌথ বিবৃতিতে জানায়, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয় নিয়ে তারা পর্যালোচনা করছে। তবে সপ্তাহের শেষ দিকে ওমান জানায়, ‘নৌপথ ব্যবহার ফি’ আরোপের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। একই সঙ্গে তারা এও জানায়, জাতিসংঘের সমন্বয়ে তাদের উপকূলসংলগ্ন একটি ‘অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডর’ চালু করা হয়েছে। এর জবাবে ইরান জানায়, তাদের উপকূলঘেঁষা করিডরই একমাত্র অনুমোদিত নৌপথ। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত রবিবার সতর্ক করে বলেন ইরান যে ব্যবস্থায় প্রণালি পরিচালনা করছে, তার বাইরে নতুন বা ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। এতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে আরও দেরি হবে এবং উত্তেজনাও বাড়বে।

তবে ওমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিটি বিষয় নিয়ে কারিগরি আলোচনা যথারীতি চলবে। আপাতত উভয়পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং এখন থেকে জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিবৃতির বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইরান। তেহরান বারবার হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যা সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সেনা কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বারবার ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির’ কারণে ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালিয়েছে। জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্ররে সেনাঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। তেহরানের দাবি ওই হামলায় অন্তত আটটি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে।

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণে ইরান ওমানের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেবে। পারস্য উপসাগর-সংলগ্ন অন্যান্য দেশের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন ও হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। সমঝোতা স্মারকে আরও বলা হয়েছে চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুধু ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে টোল ছাড়া জাহাজ চলাচল করা যাবে। ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে তারা নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে। কেউ এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে আগের চেয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত