বোস্টনের গোধূলি লগ্নে তখন টানটান উত্তেজনা। পেনাল্টি শুটআউটের প্রথম শট নিতে এলেন কাই হাভার্টজ। পুরো মৌসুমে আর্সেনালকে ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জিতিয়ে নায়ক বনে যাওয়া এই ফরোয়ার্ডের শটটি যখন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল আটকে দিলেন, তখনই যেন জার্মানির ডানা ভাঙার গল্পটা লেখা হয়ে গিয়েছিল।
এরপর নিক ভল্টমেডের শট মিস এবং সবশেষে জোনাথন তাহ বল বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতেই ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল। সাডেন ডেথে প্যারাগুয়ের হোসে কানালের নিখুঁত শট জালে জড়াতেই ৪-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে ৪ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে স্তব্ধ করে দিল ফিফা র্যাংকিংয়ের ৪১ নম্বর দল প্যারাগুয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই এক অভেদ্য নীল-সাদা দেয়াল তুলেছিলেন প্যারাগুয়ের ৬৩ বছর বয়সী অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ গুস্তাভো আলফারো। রক্ষণাত্মক ৪-৫-১ ফরমেশনের এক গভীর চাদরে জার্মানিকে পুরো বোতলবন্দী করে ফেলেছিল তার দল। প্রথমার্ধে বলের দখল ৭৮ শতাংশ নিজের পায়ে রেখে ৩০৮টি পাসের এক ক্লান্তিকর মহড়া দিলেও প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগে কোনো শটই অন টার্গেটে রাখতে পারেনি হুলিয়ান নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। মাঠের এই একঘেয়েমি ভাঙতে একপর্যায়ে ডিফেন্ডার আন্টোনিও রুডিগার মাঝমাঠ থেকে এক দূরপাল্লার বুলেটে ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলেন, যা কেবল জার্মান ফুটবলারদের মাঠের ভেতরের চরম অসহায়ত্ব আর হতাশারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।
উল্টো ৪২ মিনিটে প্রথম কাউন্টার অ্যাটাক থেকেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো বোস্টন স্টেডিয়াম। মিগুয়েল আলমিরোনের পাস থেকে মাতিয়াস গ্যালারজার ক্রসে চমৎকার হেডে গোল করে লাতিন আমেরিকার দেশটিকে এগিয়ে দেন মাত্র ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার হুলিও এনসিসো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই ছিল প্যারাগুয়ের ইতিহাসে প্রথম গোল। গ্যালারিতে যখন প্যারাগুয়ান সমর্থকদের ড্রামের আওয়াজ আর উল্লাস ভাসছিল, তখন মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ৩৮ বছর বয়সী নাগেলসম্যানের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যাওয়া জার্মানি অবশ্য দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালায়। ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের চমৎকার ইনসুইং ক্রস থেকে এবার দৃষ্টিনন্দন হেডে সমতা আনেন কাই হাভার্টজ। প্রিমিয়ার লিগের চেনা ঘরানায় উইং ধরে করা এই আক্রমণটিই যেন ম্যাচের প্রাণ ফিরিয়ে আনে। এরপর খেলা জমে উঠলেও গোল মিসের মহড়ায় নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয় ১-১ সমতায়।
ম্যাচের নাটকীয়তা চরমে পৌঁছায় অতিরিক্ত সময়ে। ১০২ মিনিটে জোনাথন তাহ হেডে বল জালে জড়িয়ে জার্মানিকে প্রায় জয়ের উৎসবে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ভিএআর রিভিউয়ের পর রেফারি গোলটি বাতিল করেন, কারণ গোল হওয়ার ঠিক আগে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষককে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলেন ভালদেমার আন্তন। পরে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট শেষেও স্কোরলাইন ১-১ এবং ম্যাচ গড়ায় সেই চিরচেনা লটারি—পেনাল্টি শুটআউটে।
আর সেখানেই ঘটল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো পেনাল্টি শুটআউটে হারেনি জার্মানি। ১৯৭৬ সালের ইউরো ফাইনালের পর এই প্রথম কোনো বড় টুর্নামেন্টে টাইব্রেকারে হারল তারা। ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের লজ্জাজনক বিদায়ের পর, ২০২৬-এর শেষ ৩২-এর মঞ্চে এমন নাটকীয় পতন জার্মানির ফুটবলকে আরও একবার হতাশায় ঠেলে দিল।
বিপর্যয়ের পর ক্ষোভ আর হতাশা উগরে দিয়ে জার্মানির অধীনায়ক জশুয়া কিমিচ বলেন, “আমরা আজ রেফারি বা ভাগ্যের ওপর দোষ চাপাতে পারি না। আপনি যদি ১২০ মিনিটে প্যারাগুয়েকে হারাতে না পারেন, তবে আপনার বিদায় নেওয়াটাই প্রাপ্য।" অন্যদিকে চরম বিধ্বস্ত জার্মানির কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান বলেন, "যদি আপনি প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেন, তবে আপনি কোনো প্রথম সারির ফুটবল দল নন। আমি ভীষণভাবে হতাশ। জার্মান ফুটবলের জন্য এটি যথেষ্ট নয়।”
তবে এই অন্ধকার মুদ্রার অন্যপিঠে দাঁড়িয়ে উল্লাসে ভাসছে ৭৬ লাখ মানুষের দেশ প্যারাগুয়ে। ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে দেশটির রাজধানী আসুনসিওনের রাস্তায় এখন কেবল বাঁধভাঙা উল্লাস। ২০১০ সালে শেষ ষোলোয় জাপানকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছিল তারা। বিশ্বকাপে যা তাদের সেরা সাফল্য। তারপর তো তিন আসরে জায়গা মেলেনি মূলপর্বেই। ১৬ বছর পর সেই খরা কাটিয়ে এবার নকআউটের শুরুতে পেল আরও একবার টাইব্রেকার জিতে অভাবনীয় সাফল্য পেল লাতিন আমেরিকার দলটি।
গর্বিত প্যারাগুয়ান অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ যেমন বলছিলেন, “গভীরভাবে জার্মানিও জানত যে আমাদের হারাতে হলে তাদের রক্ত ঝরাতে হবে। কারণ আমরা আমাদের পরাজয়ের মূল্য অনেক বেশি নির্ধারণ করে রেখেছিলাম।”
আর ম্যাচের আসল নায়ক, গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল এই ঐতিহাসিক জয় পুরো দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে বলেন, “আমাদের প্রতিপক্ষ দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়েছিল। সেই হোমওয়ার্কের কারণেই আমি দুটি পেনাল্টি আটকাতে পেরেছি।” ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিদের বিদায় করে শেষ ১৬-র মঞ্চে ফিলাডেলফিয়াতে এখন ফ্রান্স অথবা সুইডেনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত প্যারাগুয়ে।