অনেকে ‘ডিজিটাল মিনিমালিজম’-এর কথা বলেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করব, তবে প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী। অভ্যাসবশত নয়, সচেতনভাবে। একটা সময়ে মানুষ অবসরে আকাশ দেখত, বই পড়ত, গল্প করত। আজ সেই সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে স্ক্রিন। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দু নয়। ডিজিটাল ডিটক্স কোনো ফ্যাশন নয়; এটি মন, সম্পর্ক ও জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার সচেতন প্রচেষ্টা। লিখেছেন সৈয়দ আখতারুজ্জামান
লেখাটা ল্যাপটপে লিখছি। আপনি হয়তো কাগজে পড়ছেন বা কোনো মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনে। আগে আমরা বলতাম, ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর এখন বলি ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের শরীরের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সারা দিনে-রাতে আমাদের শরীর কোনো না কোনোভাবে একটা ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে লেগে রয়েছে হয় ঘড়ি, নয় মোবাইল, নয় ল্যাপটপ, কিছু না কিছু গা-ঘেঁষে থাকছেই। ঘুম ভাঙার পর থেকে শুরু করে আবার ঘুমিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অবিরাম চলতে-ফিরতে-উঠতে-বসতে, এমনকি খেতে খেতেও কেউ কেউ মোবাইল স্ক্রল করে যাচ্ছেন। লঞ্চ-বাস-ট্রেনে, স্টেশনে-বন্দরে, খেয়াল করলে দেখবেন সবাই মোবাইল স্ক্রিনে মুখ গুঁজে পড়ে আছেন। কেউ কাজ করছেন, কেউ কাজ খুঁজছেন, কেউ এমনি এমনিই তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে।
আন্তর্জাতিক এক জরিপে দেখা গেছে, একজন মানুষ বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটান। হিসাব করলে বছরে প্রায় ১০০ দিনেরও বেশি সময় চলে যায় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবের স্ক্রিনে। অর্থাৎ জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেগে থাকার সময় আমরা কোনো না কোনো স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছি।
ডিজিটাল ডিটক্স আসলে কী
ডিজিটাল ডিভাইস নির্ভর জীবনযাপন থেকে মুক্তি পেতে যা যা করা হয় তাকেই সহজ কথায় ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বলে। মানে আপনি এমন কিছু করবেন যা নির্দিষ্ট সময় মেনে আপনার ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার কমিয়ে আনবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলবে। তার মানে এই নয় যে, আপনি পাহাড়ে গিয়ে ফোন খাদে ফেলে দেবেন, ল্যাপটপের দিকে ফিরেও তাকাবেন না বা আইপ্যাড ছুঁয়েও দেখবেন না। তা নয়, বরং এই ডিভাইসগুলোর ব্যবহার কমিয়ে আনবেন, যতটা না-হলেই না তারচেয়ে বেশি ব্যবহার করবেন না। এর পরিবর্তে আপনি চারপাশে চোখ মেলে তাকাবেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, স্বজন-বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাবেন, খেলবেন, ঘুরবেন, ছবি আঁকবেন যা খুশি তাই করবেন, যা আপনাকে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার থেকে দূরে রাখবে।
কেন ডিজিটাল ডিটক্স জরুরি হয়ে পড়েছে
কিছুদিন আগে একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখলাম। ঘটনাটা কয়েকে সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেছে। একজন ছাত্রী মোবাইল ফোনে কিছু একটা টাইপ করতে করতে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিল। ফুটপাতে তেমন ভিড় নেই। হঠাৎ মেয়েটা চিৎকার করে উঠল এবং তাকিয়ে দেখি তার একটা পা গর্তে ঢুকে গেছে। আশপাশে যারা ছিল তারা সাহায্য করতে ছুটে গেল। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বেশ কয়েকবার পত্রিকায় পড়েছি। আসলে আমরা প্রায় সবাই কমবেশি সেই একই অবস্থায় আছি। শরীরটা বাস্তব জগতে থাকলেও মনটা কোথাও একটা স্ক্রিনের ভেতরে আটকে আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩৬ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রায় সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে সংযুক্ত থাকে। অর্থাৎ বাস্তব জগতের পাশাপাশি তারা একটি দ্বিতীয়, ডিজিটাল জগতেও সারাক্ষণ উপস্থিত থাকার তাড়না অনুভব করে। নইলে তারা অস্থিরতায় ভোগে।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমাদের মনোযোগের ওপর। আগে একটা কাজ শুরু করলে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেটার মধ্যে ডুবে থাকতে পারত। এখন একটা নোটিফিকেশন, একটা মেসেজ বা একটা রিল পুরো মনোযোগের ধারাই ভেঙে দেয়। আমরা বই পড়তে বসি, পাঁচ মিনিট পরে ফোন দেখি। কাজ করতে বসি, একটু পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুঁ মারি। ফলে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দুনিয়ায় সবাই যেন সুখী, সফল ও ব্যস্ত। কেউ বিদেশে ঘুরছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনছে, কেউ নতুন চাকরির খবর দিচ্ছে। অন্যের জীবনের সাজানো মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে অনেকেই নিজের জীবনকে ছোট মনে করতে শুরু করেন। সবসময় অনলাইনে থাকার একটা অদৃশ্য চাপও তৈরি হয়েছে। মেসেজ দেখেও উত্তর না দিলে অপরাধবোধ হয়, ফোন না ধরলে অস্বস্তি লাগে।
ঘুমের ওপরও এর প্রভাব কম নয়। রাতে ঘুমানোর আগে অনেকেই বলেন, ‘আর মাত্র পাঁচ মিনিট।’ সেই পাঁচ মিনিট কখন আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা হয়ে যায় টেরই পাওয়া যায় না। মোবাইলের নীল আলো আমাদের মস্তিষ্ককে বুঝতে দেয় না যে এখন বিশ্রামের সময়। ফলে ঘুম আসে দেরিতে, ঘুমের মানও কমে যায়। আপনি হয়তো এর প্রভাব আজ বুঝতে পারছেন না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব মারাত্মক।
আরেকটা বিষয় খুব নীরবে ঘটছে। বাস্তব সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। একসময় রাতের খাবারের টেবিলে গল্প হতো। এখন একই টেবিলে চারজন মানুষ বসে আছেন, চারজনের চোখ চারটা আলাদা স্ক্রিনে। কথাবার্তা হচ্ছে কম, স্ক্রল হচ্ছে বেশি। পরিবার একসঙ্গে থেকেও যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কেউ কারও পরিস্থিতি অনুভব করতে পারছেন না অনেকটাই স্রেফ সৌজন্যবোধ আহারে তাই নাকি! ওহো! ইস! বলিস কি! ঐ পর্যন্তই।
এর সঙ্গে আছে তথ্যের বন্যা। প্রতিদিন হাজার হাজার খবর, ভিডিও, রিলস, পোস্ট আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। সবকিছু জানা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত এত তথ্য প্রক্রিয়া করতে হচ্ছে যে বিশ্রামের সুযোগই কমে যাচ্ছে। আর সবসময় আপডেটেড থাকাও একটা সামাজিক চাপ বলিস কি! এই খবরটা জানিস না, ঐ খবরটা শুনিসনি!!
ডিজিটাল আসক্তির লক্ষণগুলো কী?
এখন একটু নিজের দিকে তাকান। আপনি কি কখনো কারণ ছাড়াই ফোন হাতে নেন? সময় দেখার জন্য ফোন খুলে শেষ পর্যন্ত অন্য কিছু দেখতে শুরু করেন? দুই মিনিটের জন্য ফেসবুকে ঢুকে কখন রিল দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা পার হয়ে যায় বুঝতেই পারেন না? বাথরুমে গেলেও ফোন নিয়ে যেতে হয়?
অনেকেই বলেন, ‘আমার কোনো আসক্তি নেই।’ কিন্তু মোবাইল কয়েক ঘণ্টা কাছে না থাকলে যদি অস্বস্তি লাগে, বারবার পকেট হাতড়ে ফোন খোঁজা শুরু করেন, কিংবা নোটিফিকেশন না এলেও বারবার স্ক্রিন জ্বালিয়ে দেখেন তাহলে হয়তো একটু ভাবার সময় এসেছে।
আরেকটা সহজ প্রশ্ন করা যাক। গত এক সপ্তাহে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কতক্ষণ গল্প করেছেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় কত ঘণ্টা কাটিয়েছেন? উত্তরটা হয়তো আমাদের অনেক কিছু বুঝিয়ে দেবে।
ডিজিটাল ডিটক্স কীভাবে শুরু করা সম্ভব?
ডিজিটাল ডিটক্স মানেই সবকিছু একদিনে বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে কার্যকর। প্রথমে প্রতিদিন মাত্র ত্রিশ মিনিট স্ক্রিনমুক্ত সময় রাখুন। এই সময়টায় ফোন সাইলেন্ট করে দূরে রাখুন। দেখুন কেমন লাগে।
দ্বিতীয়ত, জরুরি নয় এমন নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। প্রতিটি অ্যাপের খবর সঙ্গে সঙ্গে জানার প্রয়োজন নেই। পৃথিবী থেমে যাবে না।
তৃতীয়ত, বাড়িতে কয়েকটি ‘ফোন-মুক্ত অঞ্চল’ তৈরি করতে পারেন। যেমন ডাইনিং টেবিল বা শোবার ঘর। খাবার সময় কিংবা ঘুমানোর আগে ফোন নয় এমন নিয়ম পরিবার মিলে তৈরি করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারেরও নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা যেতে পারে। যখন-তখন নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার।
কিছু বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন : বই পড়া, হাঁটাহাঁটি করা, গাছের যতœ নেওয়া, ছবি আঁকা, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা এসব কাজ আমাদের ধীরে ধীরে স্ক্রিনের বাইরে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
অনেক দেশে এখন ‘ডিজিটাল সাবাথ’ জনপ্রিয় হচ্ছে। সপ্তাহে একটি দিন বা কয়েক ঘণ্টা সম্পূর্ণ স্ক্রিনমুক্ত থাকা। প্রথমে কঠিন মনে হলেও পরে অনেকেই এটাকে মুক্তির অনুভূতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
ডিজিটাল ডিটক্সের উপকারিতা
ডিজিটাল ডিটক্সের সবচেয়ে বড় লাভ হলো মনোযোগ ফিরে আসা। কাজ, পড়াশোনা কিংবা সৃজনশীল কাজে আগের চেয়ে বেশি সময় ধরে মন দেওয়া সম্ভব হয়।
মানসিক অস্থিরতাও কমে যায়। সব খবর, সব পোস্ট, সব বিতর্কের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে না রাখলে মন অনেকটাই হালকা লাগে।
ঘুম ভালো হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সতেজ অনুভূত হয়। দিনটাও ভালো যায়।
সৃজনশীলতাও বাড়ে। কারণ নতুন চিন্তার জন্য মস্তিষ্ককে কিছুটা খালি জায়গা দিতে হয়। সারাক্ষণ তথ্য ঢুকতে থাকলে সেই জায়গাটা আর থাকে না।
সবচেয়ে বড় কথা, বাস্তব সম্পর্কগুলো আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা নিজের সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ডিজিটাল ডিটক্স কি সবার জন্য সম্ভব?
আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি ছাড়া থাকা প্রায় অসম্ভব। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োজন। তাই লক্ষ্য প্রযুক্তি থেকে পালানো নয়। মূল কথা হলো ভারসাম্য। প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হব না।
অনেকে এখন ‘ডিজিটাল মিনিমালিজম’-এর কথা বলেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করব, তবে শুধুমাত্র প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী। অভ্যাসবশত নয়, সচেতনভাবে। একসময় মানুষ অবসর সময়ে আকাশ দেখত, বই পড়ত, গল্প করত। আজ সেই সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে স্ক্রিন। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু জীবনের কেন্দ্রবিন্দু নয়। ডিজিটাল ডিটক্স কোনো ফ্যাশন নয়; এটি মন, সম্পর্ক ও জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার সচেতন প্রচেষ্টা। হয়তো প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা নয়, পরিকল্পিতভাবে মাত্র কয়েক মিনিটের স্ক্রিনমুক্ত সময় থেকেই শুরু হতে পারে নিজের কাছে ফিরে আসার যাত্রা।