নতুন মুদ্রানীতি রাজস্বনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৮ এএম

জাতীয় বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন অনুপস্থিত বলে মন্তব্য করেছেন, ব্যবসায়ী নেতা ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নতুন মুদ্রানীতি রাজস্বনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূূর্ণ। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতি ঘোষণার পর তারা এ মন্তব্য করেন। ব্যবসায়ী নেতারা নতুন মুদ্রনীতিকে বেসরকারি খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মনোভাব বলে অভিহিত করেছেন।

জানা গেছে, মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুদ্রানীতি ঘোষণায় বলা হয়েছে, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি করেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার (রেপো) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এ ছাড়া আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। 

এদিকে মুদ্রানীতি ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিমুখী বাজেট মøান হতে পারে কঠোর মুদ্রানীতিতে।

বিবৃতিতে ডিসিসিআই জানিয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে আসার পরও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং এতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে, সদ্য অনুমোদিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন অনুপস্থিত, যা রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকায় ঋণের ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়িক কর্মকা-ে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলকে ডিসিসিআই স্বাগত জানায়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই তহবিলের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এবং টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা সিএমএসএমই, রপ্তানিমুখী শিল্প ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্ত, ডকুমেন্টেশনে জটিলতা কমানো এবং দ্রুত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই তহবিলের আওতায় আনতে হবে।

ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকা শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা প্রদান আরও জরুরি। তাই ঢাকা চেম্বার ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানায়।

এছাড়া, সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে ব্যাংক খাতের সীমিত তারল্যের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব প্রণোদনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত না হলে সেসব উদ্যোগের কাক্সিক্ষত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না। তাই ঢাকা চেম্বার মনে করে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বেসরকারি খাত নির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন মুদ্রানীতিকে গতানুগতিক মনে হলেও অনেকগুলো ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে বিগত চার বছরের নীতি সুদহারের যে ধারাবাহিকতা সেখানে আশা করা হয়েছিল পরিবর্তন আসেব। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে সেটি লক্ষ করা গেল না। এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সরকারের রাজস্ব নীতির আলোকে এখন নীতি সুদহারের পরিবর্তনের সময় এসেছে বলে মনে করি। আশা করা হচ্ছিল, গত (বিদায়ী) মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটিতে পরিবর্তন আনেনি। এখন নতুন মুদ্রানীতিতেও পরিবর্তন এলো না। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কিন্তু ধারাবাহিক চেষ্টায় দেখা গেছে, এ মুদ্রানীতি উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন ভূমিকা রাখছে না। উল্টো ঋণপ্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলছে। যাই হোক, সরকার নতুন করে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তারা (আইএমএফ) ঢাকায় আসবে। সেদিক থেকে হয়তো কোনো বিষয় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের রাজস্বনীতির সঙ্গে মুদ্রানীতির সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে আগামী জানুয়ারি-জুন যে মুদ্রানীতি হবে, সেখানে অন্তত নীতিসুদসহ বেসরকারি খাতের জন্য যেসব করণীয় রয়েছে, সেগুলো যাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ আলোচনা থাকা দরকার এবং গুরুত্ব পাওয়া দরকার বলে মনে করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত