ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় রাজ্য লা গুইরায় শক্তিশালী দুই দফা ভূমিকম্প আঘাত হানার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও থামেনি উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দিন-রাত কাজ করছেন উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও স্বজনরা। কিন্তু ভারী যন্ত্রপাতির সংকট, জ্বালানির অভাব এবং সীমিত সরকারি সক্ষমতার কারণে উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলের মজুত থাকা দেশ ভেনেজুয়েলাতেই এখন উদ্ধারকারী যন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি মিলছে না। ফলে বহু এলাকায় এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে মানুষ শাবল, কোদাল, লোহার রড, এমনকি খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লা গুইরার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বহু ভবনের ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ শেষ হয়নি। উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য থাকা একটি এক্সকাভেটর দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটি চালানোর মতো জ্বালানি ছিল না বলে জানান এর চালক।
সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কারমেন বেয়াত্রিজ ফার্নান্দেজের মতে, বর্তমান সংকট শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সেবামূলক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ারও প্রতিফলন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সক্ষমতা জনসেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে অন্য খাতে ব্যয় হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, প্রাথমিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উদ্ধার অভিযান আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্থানীয় পর্যায়ে নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পিতভাবে উদ্ধারকাজ পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবকদেরও বিভিন্ন অগ্রাধিকারভিত্তিক এলাকায় কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, এমন সংকটে জনগণের পাশে থাকাই এখন তার প্রধান দায়িত্ব।
প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে ধীরগতির উদ্ধার অভিযান
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি নয়তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে প্রকৌশলী হাসেল মেনদোজার মা, বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেকে। পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে লা গুইরায় ছুটে এসেছেন।
মেনদোজা জানান, উদ্ধারকারী দলের কাছে ইস্পাত কাটার যন্ত্র, ড্রিল, লাইফ ডিটেকশন সেন্সর কিংবা অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জাম না থাকায় অমূল্য সময় নষ্ট হয়েছে। তার মতে, শুধু পানি বা ত্রাণসামগ্রী দিয়ে এমন বিপর্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়; কার্যকর উদ্ধার অভিযানের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি জরুরি।
সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রাণহানি আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা
মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জনে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আশঙ্কা করছে, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় জাতিসংঘ জানিয়েছে, সম্ভাব্য আরও মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ভেনেজুয়েলা সরকার ও সংস্থাটি যৌথভাবে ১০ হাজার বডি ব্যাগ সংগ্রহ করছে। লা গুইরা বন্দরে ইতোমধ্যে সারিবদ্ধভাবে রাখা অসংখ্য কফিনও বিপর্যয়ের গভীরতা তুলে ধরছে।
'এখন কান্না করার সময় নয়'
ভূমিকম্পে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্পগুলোর একটি ডেইভিস রামোসের। দুর্যোগের সময় তার দুই মেয়ে, সাত বছরের আন্তোনেলা ও দুই বছরের দুলসে মারিয়া, তাদের নানা-নানির বাসায় ছিল। ভবনটি ধসে পড়ার পর থেকে পরিবারের পাঁচ সদস্যের কোনো খোঁজ নেই।
ভূমিকম্পের সময় বন্দরে কর্মরত ছিলেন রামোস। খবর পেয়ে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি নিজেই উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। এরপর থেকে টানা কয়েক দিন ধরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চলেছেন।
রামোস বলেন, 'এখন কান্না করার কথা ভাবতে পারি না। কান্নায় একটি পাথরও সরবে না। আমার দরকার শুধু শক্তি, যাতে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারি।'
এ পর্যন্ত তিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে শাশুড়ির মোবাইল ফোন, সেলাইয়ের টেবিল এবং নিজের মেয়ের একটি বিছানা উদ্ধার করেছেন। কিন্তু দুই সন্তানের কোনো সন্ধান এখনও পাননি।
তিনি বলেন, 'আমরা বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন শুধু চাই তাদের কাছে পৌঁছাতে এবং সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানাতে।'
এখনও শেষ হয়ে যায়নি আশা
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, ভূমিকম্পের কয়েক দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষকে উদ্ধার করার নজির রয়েছে। তাই এখনও উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি সমাপ্ত ঘোষণা করার সময় আসেনি।
উদ্ধারকর্মীদের আশা, সময় যতই পেরিয়ে যাক, ধ্বংসস্তূপের নিচে কোথাও না কোথাও এখনও জীবনের স্পন্দন লুকিয়ে থাকতে পারে। আর সেই আশাতেই দিন-রাত এক করে চলছে উদ্ধার তৎপরতা।