পে-স্কেলের গেজেট কবে, কতটা স্বস্তি পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা?

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:০২ পিএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা এসেছে। ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে বেতন বাড়লেও সেই অর্থ কবে হাতে আসবে, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে কৌতূহল ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেল শেষ পর্যন্ত কতটা স্বস্তি এনে দেবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ধরন ও সময়সূচির ওপর।

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেতে পারেন। এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।

তবে ঘোষণার পরও নতুন বেতন হাতে পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। কারণ প্রজ্ঞাপন জারি, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতির কাজ এখনো শেষ হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিব কমিটির সুপারিশ শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পে-কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটি ইতোমধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর পৃথক তিনটি পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে কমিটি শিগগির অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাদের চূড়ান্ত মতামত দেবে।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে দুই ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম বছর পুরো মূল বেতন কার্যকর করা হবে এবং দ্বিতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় করা হবে।

একই সঙ্গে তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। সেখানে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত কয় ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সচিব কমিটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে অর্থ বিভাগের কারিগরি কর্মকর্তারা মনে করছেন, মূল বেতন দুই ধাপে কার্যকর করলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবিএএসে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই তারা একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ভাতা সমন্বয় করলে বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে বলে তাদের অভিমত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস করা হবে। কিছু ভাতা কমানো কিংবা একীভূত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে বলেই ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও বাড়তি বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। তাঁর ভাষ্য, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা কঠিন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, নতুন পে-স্কেল কার্যকরের আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু নিজের নয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-সম্পদের তথ্যও প্রতিবছর হালনাগাদ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, নবম পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়ের দাবি। মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্ধিত বেতন তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত করতে সহায়ক হবে।

তবে তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিতে এমনও এক শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের বেতনের প্রয়োজনই হয় না। তাদের বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। তাঁর মতে, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সময়ে দেশে যে আর্থিক লুটপাট হয়েছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশও জড়িত ছিলেন। তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তির আশা তৈরি করলেও বাস্তবে সেই সুবিধা পুরোপুরি পেতে গেজেট প্রকাশ, কারিগরি প্রস্তুতি এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত